ব্যাংক ঋণের চড়া সুদ দেশের অর্থনীতির জন্য চ্যালেঞ্জ। কেননা এত সুদ থাকলে বিনিয়োগ হবে না। আর বিনিয়োগ না হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না। এছাড়া ঋণখেলাপি, কৃষি-শিল্প বহুমুখীকরণ না হওয়া, আর্থিক খাতে সুশাসনের সংকট, বাজেট ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতার অভাব এবং বৈষম্য বৃদ্ধিসহ নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে অর্থনীতিতে।
এসব মোকাবেলা করা না গেলে অর্থনীতি আরও বেশি চাপের মুখে পড়বে। পাশাপাশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি শুধু সংখ্যাগত দিক দিয়ে নয়, এটি হতে হবে কার্যকর। কর্মসংস্থান বাড়াতে নিতে হবে ব্যাপক উদ্যোগ। রাজধানীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে শনিবার সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ২০১৯ : অর্থনৈতিক দুর্দশা এবং সুশাসনের চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান। সিজিএসের সভাপতি ড. মোহাম্মদ আতাউর রহমানের সভাপতিত্বে সেমিনারে বিশেষ অতিথি ছিলেন বিএনপির স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমানের পরিচালনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, আমরা ঝুঁকি নিয়ে মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছি। আমরা খাতার পাতা উল্টাতে উল্টাতে বা ব্যালেন্স শিট মেলাতে মেলাতে সময় শেষ করিনি। মেগা প্রকল্পগুলো অর্থনীতি ও সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আনবে। গত ১১ বছর জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক স্থিতিশীলতা প্রমাণিত। তাই স্থিতিশীলতা হাতছাড়া করতে চাই না, উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে চাই। আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীরা, আপনারাও আমাদের ছাড়ার চেষ্টা করবেন না, তাহলে জনগণ বাধা দেবে।
মূল প্রবন্ধে আর্থিক খাতের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে বলা হয়, সরকারি হিসেবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি তরতর করে এগোচ্ছে। জাতীয় আয় বা জিডিপি হচ্ছে বিনিয়োগ, ভোগ, সরকারি ব্যয় এবং আমদানি-রফতানির সমষ্টি। এ চলকগুলোর পরিবর্তন এলে জিডিপি কমে বা বাড়ে। কিন্তু দেশে জাতীয় আয়ের হিসাবে গরমিল রয়েছে। কেননা জনগণের একটি বড় অংশ বেকার থাকায় ও বেকারত্ব বাড়ায় আয় বাড়ছে না। রাজস্ব আয়-ব্যয়ের ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। সাম্প্রতিককালের বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কর আদায়ের পরিমাণ যেমন কম, তেমনি করের আওতাও বাড়েনি। ফলে অন্যান্য বছরের মতো এ বছরের বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে না, তাই সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে। ঘোষিত ও সংশোধিত বাজেটের কর আদায়ের পরিমাণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য বিদ্যমান। এছাড়া প্রশাসন খাতে ব্যয় বাড়ছে। চলতি হিসাবে ভারসাম্যে ঘাটতি লক্ষণীয়। গত ২ বছর ধরে রফতানি ও প্রবাসী আয়ের গতি শ্লথ এবং আমদানি ব্যয়ে উচ্চ প্রবৃদ্ধি চলতি হিসাবের ভারসাম্যে ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করছে।
মূল প্রবন্ধে আরও বলা হয়, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে গুণগত মানের প্রকটতা রয়েছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত সবচেয়ে অবহেলিত থাকছে। অবকাঠামোতে খরচ বাড়লেও গুণগতমান কমছে। কৃষি ও শিল্প খাত বহুমুখীকরণ হচ্ছে না। ফলে উৎপাদনশীলতা যেমন বাড়ছে না, তেমনি কৃষক ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। পার্শ্ববর্তী অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের হার এখন সর্বোচ্চ- ১১ দশমিক ৮৭ শতাংশ। রাজনৈতিক প্রভাব দোষে দুষ্ট পরিচালনার কারণে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোতে অব্যবস্থাপনা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শিথিল তদারকি এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজের দুর্বলতা সুষ্ঠু অর্থনেতিক ব্যবস্থাপনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। দেশে অসমতা হুহু করে বাড়ছে। বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে অনেক পেছনে রয়েছে দেশ। এছাড়া বাজেট ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতার চর্চা নেই। ফলে সংসদে উপস্থাপনের পর কার্যকর আলোচনা ছাড়াই তা আইনে পরিণত হয়।
পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ব্যাংকিং খাত নিয়ে সরকার সচেতন। আমরা দেখার চেষ্টা করছি। তবে ব্যাংকিং খাতে এমন কিছু হয়নি যে ব্যাংক কলাপস করবে বা চেক ডিজঅনার হচ্ছে। এরকম তো কিছু হচ্ছে না। ব্যবসা-বাণিজ্য সবই তো চলছে। তবে একথা বলা যায়, সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে মিস-ম্যাচ হচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, আলোচনায় এসেছে সবই আছে। কিন্তু পাবলিক আমাদের সঙ্গে নেই- এটা ঠিক নয়। কেননা মাঠে, ঘাটে, গাছতলা এবং নদী পারের সাধারণ মানুষের কাছে আমরা সম্মান পাই, গ্রামে গেলে চা খেতে পাই। কিছু মানুষের সঙ্গে দূরত্ব থাকলেও সাধারণ মানুষের ভালোবাসা যতদিন পাওয়া যাবে, হাততালি যতদিন পাব ততদিন আমরাও থাকব।
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, পরিকল্পনামন্ত্রী বলেছেন মাঠে, ঘাটে, নদী পারের জনগণ তাদের সঙ্গে আছেন। তা প্রমাণ করার জন্য নিরপেক্ষ নির্বাচন দিন। দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র দেশ বাংলাদেশ যেখানে অনির্বাচিত সরকার দেশ পরিচালনা করছে। তাই এটি গ্রহণযোগ্য নয়। বলা হচ্ছে, গণতন্ত্র থাকা না থাকা বড় কথা নয়, এটা হল উন্নয়নের রাজনীতি। এটি একটি প্রতারণা। ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি রাজনৈতিক পুঁজি। এ কারণে এ প্রবৃদ্ধি বিশ্বাসযোগ্য নয়। ব্যাংকিং খাতের অবস্থা খারাপ। তারল্য সংকট রয়েছে প্রচুর। পরিকল্পনামন্ত্রী বলেছেন, উন্নয়নের জন্য অবারিতভাবে ক্ষমতায় না থাকলে নাকি সব ধ্বংস হয়ে যাবে। এরকম মানসিকতা দুঃখজনক। তিনি বলেন, ১০-১২ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প যদি ব্যয় বেড়ে ৩০ হাজার কোটি টাকা হয়, তাহলে সেটি কি প্রকৃত সরকারি বিনিয়োগ হবে? ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ হচ্ছে দুর্নীতির কেন্দ্রবিন্দু। আমাদের সময়ে ব্যাংকিং বিভাগ বাতিল করা হয়েছিল।
বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আনোয়ারুল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, ব্যাংক সুদের হার ৯ শতাংশ বলা হলেও কোনো ব্যাংক মানছে না। তার ওপর গ্যাসের দাম বাড়ার কথা শুনলে ভাবি আমরা শিল্পে প্রবৃদ্ধি চাই কিনা? সেবা খাতে ৫ টাকা বৃদ্ধি বড় সমস্যা হবে না। কিন্তু শিল্প খাতে ২ টাকা খরচ বাড়লে তার প্রভাব ব্যাপক।
ইউএনডিপির সাবেক পরিচালক অধ্যাপক সেলিম জাহান বলেন, প্রবৃদ্ধি সংখ্যাগত দিক থেকে নয়, ভাবতে হবে- কিসের প্রবৃদ্ধি, কার জন্য প্রবৃদ্ধি এবং কেমন প্রবৃদ্ধি? এসব বিষয় প্রশ্ন তুলতে হবে। প্রবৃদ্ধির জন্য প্রবৃদ্ধি নয়, মানব উন্নয়নের জন্য প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। বৈষম্যের কারণে এক সময় মানুষ রাজনৈতিক বোমায় পরিণত হবে।
বিসিআইর সাবেক সভাপতি সাহেদুল ইসলাম হেলাল বলেন, যখনই সরকার বলে, ব্যাংক ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশ হবে, তখনই ব্যাংক থেকে চিঠি দিয়ে আমার সুদ হার বাড়িয়ে দেয়া হয়। অথচ আমি দীর্ঘ বছর ধরে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করলেও একটি কিস্তিও খেলাপি হয়নি। চড়া হারে সুদে দিয়ে ব্যবসা করতে সমস্যা হয়। কোনো বড় শিল্পঋণ খেলাপি হলে সে একা মরে না, তার সঙ্গে ৫-৬ ছোট ছোট শিল্পও মারা যায়। অথচ তাদের খোঁজ আমরা রাখি না।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন বলেন, বাজেটে নিু আয়ের মানুষের জন্য কোনো সুখবর নেই। ব্যাংকিং খাত বিষয়ে শক্ত কোনো সিগন্যাল দেয়া হয়নি। এ খাতে নজর দিতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে কোনো কমিশনই কার্যকর হয়নি। তাই ব্যাংক কমিশন করাটা বড় কথা নয়।
ড. আতাউর রহমান বলেন, ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ বড় দুর্ভাবনার বিষয়। সুশাসনের অভাব রয়েছে। বিরোধী দল মনে করছে, দুর্নীতি কমছে না। ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিক সুশাসন জরুরি।
অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ বন্ড মার্কেট চালু করা সম্ভব নয়। কেননা এখানে কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা কমেছে। তবে সরকারিভাবে হলে মানুষ বিশ্বাস করে। বিশ্বাসের অভাবেই বন্ড মার্কেট কার্যকর হবে না।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ বলেন, সুশাসন ও জবাবদিহিতা না থাকলে উন্নয়ন টেকসই হবে না। ভারসাম্য না থাকলে কিছুই হবে না। পাকিস্তান আমলে ভারসাম্যহীন নীতির কারণে টিকতে পারেনি।
মহিলা লীগ সভাপতি নাজমা আক্তার বলেন, যারা বছরে ৩ কোটি টাকা আয় করেন তারা যদি সঠিকভাবে কর দেন তাহলে দরিদ্র্যদের ঘাড়ে করের চাপ আসত না।
মহিলা দলের সভাপতি সৈয়দা আসিফা আশরাফ পাপিয়া বলেন, উন্নয়নের প্রকৃত তথ্য জানার অধিকার সবার আছে। প্রকৃত তথ্য জনগণের কাছে তুলে ধরতে হবে।
News courtesy: https://www.jugantor.com/