ব্যাংকিং খাত নিয়ে সমালোচনা প্রসঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেছেন, ব্যাংকিং খাত নিয়ে সরকার সচেতন। বিষয়টি আমরা দেখার চেষ্টা করছি। ব্যাংক কলাপস্ করেছে বা চেক ডিজঅনার হচ্ছে এমন তো কিছু হচ্ছে না। ব্যবসা-বাণিজ্য সবই তো চলছে। তবে এ কথা বলা যায়, সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে মিস ম্যাচ হচ্ছে।
গতকাল রাজধানীর মহাখালীস্থ ব্র্যাক ইন সেন্টারে অনুষ্ঠিত ‘অর্থনৈতিক শঙ্কা ও সুশাসনের চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্য পরিকল্পনামন্ত্রী এ মন্তব্য করেন। সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আতাউর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সিজিএস নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমানের পরিচালনায় সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। এতে বক্তব্য রাখেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান, অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ, ইউএনডিপির সাবেক পরিচালক অধ্যাপক সেলিম জাহান, এনবিআর সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ, বিআইডিএসের গবেষক ড. নাজনীন আহমেদ, যুব মহিলা লীগের সভাপতি নাজমা আক্তার, বিএনপির সাবেক এমপি সৈয়দা আসিফা আশরাফ পাপিয়া ও বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আনোয়ারুল আলম চৌধুরী পারভেজ।
মূল প্রবন্ধে বলা হয়েছে, জাতীয় আয় বা জিডিপি হচ্ছে বিনিয়োগ, ভোগ, সরকারি ব্যয় ও আমদানি-রফতানির সমষ্টি। এ চলকগুলোয় পরিবর্তন এলে জিডিপি কমে বা বাড়ে। কিন্তু দেশে জাতীয় আয়ের হিসেবে গরমিল রয়েছে। রাজস্ব আয়-ব্যয়ের ভারসাম্যহীনতার কারণে সাম্প্রতিককালের বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কর আদায়ের পরিমাণ যেমন কম, তেমনি করের আওতাও বাড়েনি। ফলে অন্যান্য বছরের মতো গত বছরের জুনে ঘোষিত এ বছরের বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে না। ঘোষিত ও সংশোধিত বাজেটের কর আদায়ের পরিমাণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।
পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, খাতার পাতা উল্টাতে বা ব্যালান্স শিট মেলাতে সময় শেষ না করে মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। মেগা প্রকল্পগুলো অর্থনীতি ও সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আনবে। তাই আমরা ঝুঁকি নিয়ে হলেও এসব প্রকল্প হাতে নিয়েছি। ব্যালান্স শিট মেলাতে গিয়ে সময় শেষ করিনি। তিনি বলেন, গত ১১ বছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রমাণ আমরা দিয়েছি। এই স্থিতিশীলতা হাতছাড়া করতে চাই না। জনগণও চায় না। এই স্থিতিশীলতায় কেউ আঘাত করতে চাইলে জনগণই বাধা দেবে।
পরিকল্পনামন্ত্রীর বক্তব্যের রেশ ধরে বিএনপি নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, মাঠে-ঘাটে, নদীর পারে জনগণ তাদের সাথে আছেন। তা প্রমাণ করার জন্য নিরপেক্ষ নির্বাচন দরকার, যার ব্যবস্থা দেশে নেই। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র দেশ, যেখানে অনির্বাচিত সরকার দেশ পরিচালনা করছে।
সরকারের পক্ষ থেকে যে উন্নয়নের দাবি করা হয়, তাকে ‘রাজনৈতিক উন্নয়ন’ বলে অভিহিত করে আমীর খসরু বলেন, ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি পলিটিক্যাল ক্যাপিটাল। এ কারণে এ প্রবৃদ্ধি বিশ্বাসযোগ্য নয়। ব্যাংকিং খাতের অবস্থা খারাপ। তারল্য সঙ্কট রয়েছে। পরিকল্পনামন্ত্রী বলেছেন, ক্ষমতায় না থাকলে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধ্বংস হয়ে যাবে, এরকম মানসিকতা দুঃখজনক। তিনি বলেন, ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প যদি ৩০ হাজার কোটি টাকায় হাতে নেয়া হয়, তাহলে সেটি কি প্রকৃত বিনিয়োগ হবে? ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ দুর্নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, বাজেটে নি¤œ আয়ের মানুষের জন্য কোনো সুখবর নেই। ব্যাংকিং খাত বিষয়ে শক্ত কোনো সিগন্যাল দেয়া হয়নি। এ খাতে নজর দিতে হবে।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ বন্ড মার্কেট চালু করা সম্ভব নয়। কেননা এখানে করপোরেট কোম্পানিগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা কমেছে। সরকারিভাবে হলে কিছুটা বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে। তবে বিশ্বাসের অভাবেই বন্ড মার্কেট কার্যকর হবে না।
ইউএনডিপির সাবেক পরিচালক অধ্যাপক সেলিম জাহান বলেন, প্রবৃদ্ধি সংখ্যাগত দিক থেকে নয়, ভাবতে হবে কিসের প্রবৃদ্ধি, কার জন্য প্রবৃদ্ধি ও কেমন প্রবৃদ্ধি? এসব বিষয়ে প্রশ্ন তুলতে হবে। প্রবৃদ্ধির জন্য প্রবৃদ্ধি নয়, মানব উন্নয়নের জন্য প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। বৈষম্যের কারণে একসময় এটি রাজনৈতিক বোমায় পরিণত হবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, সুশাসন ও জবাবদিহিতা না থাকলে উন্নয়ন টেকসই হবে না। ভারসাম্য না থাকলে কিছুই হবে না।
বিআইডিএসের গবেষক ড. নাজনীন আক্তার বলেন, উৎপাদনশীলতা ও অভ্যন্তরীণ চাহিদার কারণে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। কিন্তু শ্রমিকের দক্ষতা বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে পোশাক খাতের শ্রমিকদের দিকে নজর দিতে হবে।
যুব মহিলা লীগের সভাপতি নাজমা আক্তার বলেন, যারা বছরে তিন কোটি টাকা আয় করেন, তারা যদি সঠিকভাবে কর দেন তাহলে দরিদ্রদের ঘাড়ে করের চাপ আসত না।
বিএনপির সাবেক এমপি সৈয়দা আসিফা আশরাফ পাপিয়া বলেন, উন্নয়নের প্রকৃত তথ্য জানার অধিকার সবার আছে। প্রকৃত তথ্য জনগণের কাছে তুলে ধরতে হবে।
বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আনোয়ারুল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, ব্যাংক সুদের হার ৯ শতাংশ বলা হলেও কোনো ব্যাংক তা মানছে না। তার ওপর গ্যাসের দাম বাড়ার কথা শুনলে ভাবি, আমরা শিল্পে প্রবৃদ্ধি চাই কি না। সেবা খাতে ৫ টাকা বাড়ালে তেমন বড় সমস্যা হবে না। কিন্তু শিল্প খাতে ২ টাকা খরচ বাড়লে তার প্রভাব ব্যাপক।
News Courtesy: http://www.dailynayadiganta.com