স্বাধীনতার ৫০ বছরে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এগিয়েছে বাংলাদেশ। গার্মেন্ট, কৃষি ও সেবা খাত এ উন্নতিতে বড় অবদান রাখছে। তবে এখনো প্রশ্ন হয়ে রয়েছে গণতন্ত্রচর্চা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইন, ন্যায়বিচার ও দুর্নীতি। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি সুশাসন প্রতিষ্ঠায়ও বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। সিজিএসে’র ডায়ালগে বক্তারা এসব কথা বলেন। শনিবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ‘৫০ বছরে বাংলাদেশ : পথ ও পথচলা’ শীর্ষক দিনব্যাপী এ ডায়ালগ অনুষ্ঠিত হয়। এতে ১৩টি সেশনে মন্ত্রী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, বিশেষজ্ঞ, কূটনীতিক ও খ্যাতিমান পেশাজীবীরা অংশ নেন।
বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কাছে উন্নয়নের রোড মডেল। অর্থনৈতিক এ উন্নতি করে দেখিয়েছে বাংলাদেশ। এ অবস্থায় দেশের গণতন্ত্রচর্চা প্রশ্নবিদ্ধ, মানুষ ভোট দিতে পারছে না। মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে কার্যকর ভূমিকা অনুপস্থিতি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অনুপস্থিতি প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুশীল সমাজ এখন সঠিক রোল প্লে করছে না। দেশে সুন্দর রাজনৈতিক, গণতান্ত্রিক ও আইনের চর্চার পরিবেশ সৃষ্টি করা দরকার। ডায়ালগে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ. ম. রেজাউল করিম বলেন, সেনাশাসনের কারণে দেশের গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ সময় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, মানুষ ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। বর্তমানে দেশ অনেক উন্নতি করেছে। ক্ষুধা, দরিদ্রতা, আবাসন ও শিক্ষার উন্নয়নে সরকার যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল অবস্থান থেকে উন্নত দেশে রূপান্তর করতে কাজ করছে সরকার। আর আইনের শাসন এ দেশে রয়েছে, সেটা বারবার প্রমাণিত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছুটা সময় লাগলেও বিচার হচ্ছে। বিচার হচ্ছে না এমন কথা বলার কোনো সুযোগ নেই।
সাবেক মন্ত্রী মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ, বীরবিক্রম বলেন, দেশের গণতন্ত্রচর্চা এখনো প্রশ্নবিদ্ধ। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে আমরা দেখেছি, যে সরকার যখন ক্ষমতায় এসেছে, তখনই মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বেড়েছে।
নিজের পছন্দের লোককে মুক্তিযোদ্ধা বানানোর এক ধরনের প্রতিযোগিতা করা হয়েছে। তিনি বলেন, দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়েছে, তবে দরিদ্র জনগোষ্ঠী পিছিয়েই থাকছে। জনগণ ভোট দিতে পারছেন না। এছাড়া চিহ্নিত দুর্নীতিবাজদের বিচারের আওতায় না আসারও সমালোচনা করেন তিনি।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সুশীল সমাজ জনগণের কথা বলে। সভ্য দেশে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা সমাজের সুশাসন ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠায় বড় ভূমিকা পালন করে। রাজনৈতিক, নাগরিক ও মানবাধিকার নিয়েই মূলত এ অংশের প্রতিনিধিরা কথা বলেন। তবে বর্তমানে দেশের সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা আইন, আইনের শাসন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা রাখছে না। তিনি বলেন, দেশের সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করছে না।
অধ্যাপক ড. আলী রিয়াজ বলেন, সুশাসন প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হয়। কিন্তু দেশের এসব প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছে না। এ কারণে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার তৎপরতা চালাতে হবে। সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বড় ইস্যু।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, গার্মেন্ট, কৃষি ও সেবা খাতের ভূমিকার কারণে দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি হচ্ছে। এসব খাতেরও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই দেশকে সামনে এগোতে হবে। তিনি বলেন, টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, পরিকল্পিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রণয়নে কাজ করতে হবে। উন্নতি ও সুশাসনের মধ্যে পরিষ্কার সম্পর্ক থাকতে হবে। বর্তমানে এসব বিষয়ের অনুপস্থিতি লক্ষ করা যাচ্ছে।
বাংলাদেশস্থ জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকি বলেন, জাপান বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের উন্নয়নের অংশীদার। বঙ্গবন্ধুর সময় থেকে জাপান বাংলাদেশের উন্নয়নে কাজ করছে। এ দেশটি এখন বিশ্বের অন্যান্য জাতির জন্য উন্নয়নের রোল মডেল। শিল্পায়ন ও অন্যান্য উন্নয়নে এ দেশটি বড় ভূমিকা পালন করছে। এসব কার্যক্রমের সঙ্গে রয়েছে জাপানও।
ডায়ালগের প্রথম সেশনে অন্যদের মধ্যে অংশ নেন ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) এম হারুন-অর-রশিদ বীরপ্রতীক, সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজের (সিজিএস) চেয়ারম্যান ড. মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরী, সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমান, বাংলাদেশস্থ তুরস্কের রাষ্ট্রদূত মোস্তফা ওসমান তুরান, ইউএনডিপি, বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ সুদীপ্ত মুখার্জি, ঢাকা ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার, ফেয়ার গ্রুপের চেয়ারম্যান রুহুল আলম আল মাহবুব, বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক আবদুল্লাহ হিল রাকিব প্রমুখ।
দুপুরের পর নিরাপত্তা ও উন্নয়ন সংক্রান্ত বিষয়ে দুটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া দেশের ইতিহাস, বিভিন্ন খাতে অর্জন, রাজনীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে পৃথকভাবে বক্তব্য দেন কয়েকজন বক্তা।
রেলপথমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন বলেন, স্বাধীনতা কারও দয়ায় আসেনি। ৩০ লাখ মানুষের জীবনের বিনিময়ে আমরা বিজয় অর্জন করেছি। তবে হ্যাঁ, এক্ষেত্রে আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত সাহায্য করেছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ অবশ্যই এগিয়ে যাবে। বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশের কাতারে চলে গেছে।
স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম বলেন, ১৯৭২ সালে মাথাপিছু গড় আয় ছিল ৯৪ মার্কিন ডলার। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর তা বাড়িয়ে ৩৪৯ ডলারে উন্নীত করে। তিনি বলেন, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ আবার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পর উন্নয়ন হতে থাকে। বিশ্বব্যাংক এক পরিসংখ্যানে জানিয়েছে, বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ২০৬৪ মার্কিন ডলার। উন্নয়ন শুধু শহরে হয়নি, গ্রামগঞ্জেও ছড়িয়ে পড়েছে।
এর আগে প্যানেল আলোচনায় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ১৯৯১ সালের পর আল কায়দা ও আইএস আন্তর্জাতিক নিরাপত্তায় নতুন হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়। বাংলাদেশে ৬৩টি জেলায় একযোগে বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে জঙ্গিরা তাদের অবস্থান জানান দেয়।
হলি আর্টিজানে হামলা করে তারা নতুন বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করে। এসব ধর্মীয় উগ্রপন্থি ও রোহিঙ্গাদের বিষয়টি সঠিকভাবে সমাধান করতে হবে।
ওই প্যানেল আলোচনায় সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হক বলেন, স্বাস্থ্য খাতে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। এ খাতকে আরও এগিয়ে নিতে ম্যানেজমেন্টের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড. সায়রা খান বলেন, এখন নতুন চ্যালেঞ্জ নিরাপত্তা। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে উভয়পক্ষকে সিকিউরিটি সংস্কৃতিতে মানিয়ে নেওয়া দরকার। বেলার নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রেজওয়ানা হাসান বলেন, দেশ অনেক এগিয়ে গেছে। এখনো অনেক ঘাটতিও রয়েছে। এসব ঘাটতি পূরণে গণতন্ত্র, বাক-স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
উন্নয়ন সংক্রান্ত প্যানেল আলোচনায় এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ বলেন, দেশ উন্নত করতে হলে রাজস্ব বাড়াতে হবে। অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠান ঠিকমতো ট্যাক্স দেয় না। তিনি একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করে বলেন, ওই প্রতিষ্ঠান ভোক্তাদের বিলের সঙ্গে ট্যাক্স আদায় করে, অথচ তা সরকারকে পরিশোধ করে না। ওই আলোচনায় এনআরবিসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান এসএম পারভেজ তমাল বলেন, সরকার অনেক উন্নয়ন প্রকল্প নিয়েছে। এ কাজে বেসরকারি ব্যাংকগুলো অংশীদার হয়েছে। এসব খাতে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ করা এবং গ্রাহকের কাছ থেকে স্বল্পমেয়াদে ডিপোজিট নেওয়া সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, রাষ্ট্রীয় অনেক প্রতিষ্ঠান প্যারালাইজড করে দেওয়া হয়েছে। এ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
দ্বিতীয় সেশনে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী, সাবেক রাষ্ট্রদূত এম শফিউল্লাহ, বিএনপি নেতা জহির উদ্দিন স্বপন, নিউএইজ সম্পাদক নূরুল কবির, ঢাকা চেম্বার অব কমার্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট সবুর খান প্রমুখ।
News Courtesy: