স্টাফ রিপোর্টার : গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের বদলে দেশে বেসামরিক কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থা চলছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলেন, ২০১৪ সালের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের পর দেশে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। একধরনের বেসামরিক কর্তৃত্ববাদ তৈরি হয়েছে। ২০০৮ সালের শেষে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বেসামরিক সরকার আসলেও কর্তত্ববাদী শাসনের বিপদ থেকে রক্ষা পায়নি বাংলাদেশ।
গতকাল শনিবার সকালে রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেন রোডে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল এন্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজজের (বিজ) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত “বাংলাদেশের নতুন মধ্যবিত্ত, গণতন্ত্র ও ধর্মের প্রশ্ন” শীর্ষক এক সেমিনারে সমাজচিন্তাবিদ, রাজনীতিবিজ্ঞানী, গবেষক, সাংবাদিক ও উন্নয়ন বিশ্লেষকরা এ কথা বলেন। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত উক্ত সেমিনারে সম্মানিত অতিথি ছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান ও ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ। সিজিএস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এম আতাউর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আলোচনায় অংশ নেন অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবং সাবেক মন্ত্রী ড. মোঃ আব্দুর রাজ্জাক, বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ইনাম আহমেদ চৌধুরী, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী, প্রবীণ সাংবাদিক-কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ, দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী ও বিজ চেয়ারম্যান মুন্সী ফয়েজ আহ্মদ।
সিজিএস’র নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরো আলোচনা করেন বিএনপি নেতা ও সাবেক এমপি জহিরউদ্দিন স্বপন, ব্যবসায়ী নেতা আব্দুল হক, যুক্তরাষ্ট্রের ব্ল্যাক হিলস স্টেট ইউনিভাসির্টির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আহরার আহমেদ, বিজ মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এ কে এম আবদুর রহমান, যুক্তরাষ্ট্র মুক্ত ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা মাহমুদ রেজা চৌধুরী, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সরওয়ার জাহান চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের ডীন অধ্যাপিকা ড. সাদেকা হালিম, ঢাবি উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহববুর রহমান, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকী, জাতীয় পার্টি (এরশাদ) চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী প্রমুখ।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সমাজচিন্তাবিদ ড. আকবর আলি খান বলেন, বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে উঠেছে রাষ্ট্রের আনুকূলে। ফলে এখানে অনেক দুর্বলতা রয়ে গেছে। তিনি বলেন, ধর্ম নিয়ে হইচই শুধু বাংলাদেশে নয়, সব দেশেই আছে। এটি দূর করা সম্ভব নয়। আবার এতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ পুরোনো পথেই আছে। ফলে এটি নিয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে শান্তিপূর্ণভাবে মোকাবিলা করতে হবে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিপিআরসি’র নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর দেশে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। একধরনের বেসামরিক কর্তৃত্ববাদ তৈরি হয়েছে। সামাজিক পরিমন্ডলেও এটি ছড়িয়ে পড়েছে। এটা বড় সংকট।
ড. আলী রীয়াজ তার প্রবন্ধে ‘ভঙ্গুর গণতন্ত্র’ থেকে কর্তৃত্ববাদী শাসনের উত্থানের আশঙ্কা করে বলেন, ২০০৮ সালের শেষে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বেসামরিক সরকার আসলেও কর্তত্ববাদী শাসনের বিপদ থেকে রক্ষা পায়নি বাংলাদেশ। ২০১৪ সালে ক্ষমতাসীনরা এককভাবে নির্বাচন করায় সংসদে বিরোধী দলের কোনো অস্তিত্বই নেই। ঐ নির্বাচনের আগে এবং পরে ক্ষমতাসীন দল এমন সব ব্যৗবস্থা গ্রহণ করেছে যা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গণতান্ত্রিক বলে বিবেচিত হতে পারে কিনা তা প্রশ্নসাপেক্ষ।
যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির এই অধ্যাপক আরো বলেন, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দুটি বড় ধরনের পরিবর্তন হয়েছে বা হচ্ছে। একটি হলো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সংকট, অন্যটি হচ্ছে রাজনীতি ও সমাজে ধর্মের ব্যাপক প্রভাব। নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ ঘটছে। কিন্তু তারা ষাটের দশকের মধ্যবিত্তের মতো রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে না। তিনি প্রশ্ন রাখেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা বা শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে মধ্যবিত্ত শ্রেণির অনুৎসাহের কারণ কী? তারা কি গণতন্ত্রকে ভিন্নভাবে দেখছে? মধ্যবিত্তের কি রাজনীতিতে ভূমিকা রাখার সুযোগ নেই? ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের দিকে বাংলাদেশ যাচ্ছে কি না?
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য আব্দুর রাজ্জাক বলেন, গত জাতীয় নির্বাচন একেবারে প্রশ্নবোধক নয়, তা তারাও বলেন না। প্রশ্নবোধক, কারণ একটি বড় দল নির্বাচনে অংশ নেয়নি। তারা নির্বাচনে অংশ নিয়ে হারলেও গণতন্ত্রের জন্য ভালো হতো। আগামী নির্বাচন যাতে সবার অংশগ্রহণে হয়, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্র নয়, উন্নয়ন আগে, এটা আওয়ামী লীগের বক্তব্য নয়।
বিএনপি নেতা ইনাম আহমেদ চৌধুরী বলেন, সত্যিকারের গণতান্ত্রিক নির্বাচন এবং এর মাধ্যমে একটি সরকার প্রতিষ্ঠা করা এখন বাঞ্ছনীয়। বিষয়টিকে এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত।
প্রবীণ বাম নেতা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, বাংলাদেশ সৃষ্টির পেছনে মধ্যবিত্তের ঐতিহাসিক ভূমিকা ছিল। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার রূপান্তরই বর্তমান সংকটের কারণ।
নির্বাচন ছাড়া গণতন্ত্র হয় কীভাবে-এমন প্রশ্ন রেখে সিনিয়র সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, নির্বাচনী প্রক্রিয়া কী হবে, কীভাবে নির্বাচন হবে, এটা ঠিক করা উচিত। বর্জনের সংস্কৃতি রাজনীতির ক্ষতি করছে।
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, এখন মুক্ত চেতনা নেই, তার কারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বর্তমান অবস্থা। তিনি বলেন, অর্থনীতিতে সাফল্য এসেছে। কিন্তু বৈষম্য ও বেকারত্ব বেড়েছে।
সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কেমন রাষ্ট্র গঠন করতে চেয়েছিলেন, তা মাথায় রাখতে হবে। তিনি বলেন, এ দেশে সমন্বয়ের সংস্কৃতি ছিল হাজার হাজার বছর ধরে। এখন সেটা হয়তো কমছে। কিন্তু এ দেশ কখনো মৌলবাদীদের হাতে যাবে না।
সভাপতির বক্তব্যে বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক আতাউর রহমান বলেন, প্রকৃত নির্বাচন না হলে সরকার বৈধতার সংকট কাটাতে পারবে না। তিনি মনে করেন, গণভোটের বিধান ফিরিয়ে আনা, সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা জরুরি।
News Courtesy: http://www.dailysangram.com/