Centre for Governance Studies, Dhaka

CGS in the media

অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হলে কর্তৃত্ববাদী শাসন

Press clipping reproduced from the original publication, as archived on the CGS website.

রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি একসময়ে যে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে তা বর্তমানে দেখা যাচ্ছে না। সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে আগের মধ্যবিত্তের সঙ্গে বর্তমান মধ্যবিত্তের মিল নেই।

বাংলাদেশে নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণি রাষ্ট্রের আনুকূল্যে গড়ে উঠেছে। এ জন্য গণতন্ত্র ও মধ্যবিত্তের মধ্যে সম্পর্ক এখানে আশা করা যায় না। ‘বাংলাদেশের নতুন মধ্যবিত্ত, গণতন্ত্র ও ধর্মের প্রশ্ন’ শীর্ষক এক সেমিনারে এমন অভিমত তুলে ধরেছেন আলোচকরা।
গতকাল শনিবার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) মিলনায়তনে ওই সেমিনারের আয়োজন করে সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস)। এতে গবেষক, রাজনীতিকসহ বিশিষ্টজনরা আশঙ্কা ব্যক্ত করে বলেন, দেশের রাজনীতিতে জবাবদিহি না এলে এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হলে দেশ দীর্ঘমেয়াদি কর্তৃত্ববাদী শাসনে চলে যাবে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান বলেন, ‘হিলারি বেশি ভোট পেয়েও প্রেসিডেন্ট হতে পারেননি। বিশ্বের বেশির ভাগ সরকার মাইনরিটি সরকার। এ অবস্থা পাল্টাতে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির নির্বাচনে যেতে হবে। ’ তিনি বলেন, বাংলাদেশে নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণি রাষ্ট্রের আনুকূল্যে গড়ে উঠেছে।

এ জন্য গণতন্ত্র ও মধ্যবিত্তের মধ্যে সম্পর্ক এখানে আশা করা যায় না।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ২০১৪-পরবর্তী সময়ে এক ধরনের বেসামরিক কর্তৃত্ববাদ শুধু রাষ্ট্রে নয়, সমাজেও তৈরি হচ্ছে। বিশ্বের অনেক স্থানে বেসামরিক কর্তৃত্ববাদ দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। সেসব দেশে নাগরিক সমাজের সমর্থন রয়েছে। কিন্তু এখানে সরকার বৈধতার সংকটে ভুগছে। তিনি বলেন, ‘আমরা যদি একাত্তরের আকাঙ্ক্ষা মাথায় রাখি তাহলে রাজনীতিতে জবাবদিহি থাকতে হবে। এর জন্য অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন প্রয়োজন। না হলে দেশ দীর্ঘমেয়াদি কর্তৃত্ববাদী শাসনে চলে যাবে। ’

সেমিনারে উপসংহারবিহীন মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক আলী রীয়াজ।

মূল প্রবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের যে তিনটি ভিত্তির কথা বলা হয়ে থাকে তার সারবস্তু হচ্ছে সব নাগরিকের সমতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করা। এই প্রতিশ্রুতি নিয়ে দেশ স্বাধীন হলেও বাংলাদেশে

গণতন্ত্র শুধু প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভেই ব্যর্থ তা নয়, এখন প্রশ্ন উঠেছে কয়েক দফা কর্তৃত্ববাদী শাসনের

অভিজ্ঞতার পরও দেশটি আবার সেই পথেই যাত্রা শুরু করেছে কি না।

আলী রীয়াজ বলেন, “গত কয়েক বছরে বিশেষত ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর থেকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে উন্নয়ন এবং গণতন্ত্রের মধ্যে একটি বিভাজন রেখা টানা হচ্ছে এবং এদের পরস্পরের বিকল্প বা প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেই উল্লেখ করা হচ্ছে। এই ধারণার আলোকে ক্ষমতাসীন দল এবং তাঁর সমর্থকদের বক্তব্য হচ্ছে যে প্রচলিত গণতন্ত্র রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি করে, যা উন্নয়নের পথে বাধাস্বরূপ। ফলে ‘কম গণতন্ত্র, বেশি উন্নয়ন’-এর পথই দেশের জন্য ইতিবাচক। ’’

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘‘আমরা হয়তো একাত্তর থেকে অনেক এগিয়েছি। দুর্ভিক্ষের অবস্থা এখন নেই। তবে এ অগ্রগতি অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে তুলনা করতে হবে। ২০০৪ সালে ‘গোল্ডম্যান স্যাকস’ অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে ১১টি দেশের অন্যতম হিসেবে চিহ্নিত করে। আমরা ২০১৭-তেও সেই ১১তমের মধ্যেই রয়ে গেছি। শিক্ষিতের হারের কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু শিক্ষার মান নিয়ে পরিসংখ্যান নেই। প্রবৃদ্ধির আলোচনা যেটা হচ্ছে তা সরকারের বৈধতার ভিত্তি হিসেবে হচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অর্থনীতি এগোচ্ছে, কিন্তু রাজনীতি এগোচ্ছে না। ‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা’ নতুন এই গ্রাফিটিটি দেশে বেকারত্বের বাস্তবতাকেই প্রকাশ করছে। ”

গবেষক ও কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, ‘বর্তমানে জ্ঞানচর্চা দুরূহ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের দিক থেকে শুধু নয়, বাইরেও বিপদ। ধর্ম নিয়ে এই সেমিনারে যা বলা হচ্ছে তা প্রচার হলে মামলা হতে পারে। দারোগা-পুলিশ দড়িটরি নিয়ে চলে আসতে পারে। এই রাষ্ট্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ। কিন্তু শত শত বছরের গড়ে ওঠা সমন্বয় সংস্কৃতি ছিল। হিংসা-বিদ্বেষের স্থান ছিল না। কিন্তু সেটা নষ্ট হয়েছে। ’

ব্যবসায়ী নেতা আবদুল হক বলেন, এখন পুঁজি উদ্যোক্তাদের হাতে নেই। যাঁর কোনো ব্যবসা নেই তিনি ব্যাংকের মালিক। উৎপাদনের সঙ্গে যাঁদের কোনো সম্পর্ক নেই তাঁদের প্যাট্রোনাইজ করা হচ্ছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, সারা বিশ্বেই রাজনীতিতে ধর্মীয় প্রভাব দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, বিএনপি ২০১৪ সালে নির্বাচনে এলে গণতন্ত্রের এই ক্ষতি হতো না। তিনি আরো বলেন, ‘উন্নয়ন না গণতন্ত্র—এই কথা আমাদের নেতৃত্বের কথা না। ’

সেমিনারে আরো বক্তব্য দেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ইনাম আহমেদ চৌধুরী, সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হোসেন চৌধুরী, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, সিজিএসের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম আতাউর রহমান, শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক, মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, যুক্তরাষ্ট্রের ব্ল্যাক হিলস স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. আহরার আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম ও ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরী, জাতীয় পার্টির ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকী, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সরওয়ার জাহান চৌধুরী প্রমুখ।

News Courtesy: http://www.kalerkantho.com/print-edition/last-page/2017/11/19/567408