যারা গণতন্ত্রের শত্রু, তারাই মুক্ত গণমাধ্যমের শত্রু এবং এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য মুক্ত গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টির কোনো বিকল্প নেই বলে সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত এক ওয়েবিনারে বক্তারা উল্লেখ করেছেন।
গতকাল বুধবার, ‘গণমাধ্যমের শত্রুমিত্র’ শীর্ষক দুই ঘণ্টাব্যাপী এই ওয়েবিনারে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ড. আবু সাইয়িদ, আমাদের নতুন সময়- এর প্রধান সম্পাদক নাঈমুল ইসলাম খান, দি ফাইন্যান্সিয়াল হেরাল্ড- এর সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ, দৈনিক দিনকাল- এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ড. রেজোয়ান সিদ্দীকি, আর্টিকেল নাইনটিন- এর দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক ফারুখ ফয়সল এবং সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস)- এর চেয়ারম্যান ড. মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরী। আলোচনা অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন সিজিএস- এর নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমান।
সাবেক তথ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ড. আবু সাইয়িদ বলেন, যারা গণশত্রু তারাই গণমাধ্যমের শত্রু। আবার এই গণশত্রু তারাই যারা সমগ্র রাষ্ট্রব্যবস্থাকে কুক্ষিগত করতে চায়, যারা সরকার ব্যবস্থাকে কেন্দ্রীভূত করতে যায় এবং লুটতরাজের ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এই ধরনের গণশত্রুদের প্রত্যক্ষ শত্রুই হচ্ছে স্বাধীন এবং নিরপেক্ষ গণমাধ্যম। গণমাধ্যমের মালিকানার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি যোগ করেন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতার অর্থই হলো মালিকপক্ষের স্বাধীনতা। সংবাদপত্র যেখানে একটি রাষ্ট্রের দর্পণ ও দর্শন সেখানে মালিকপক্ষের স্বার্থ রক্ষায় বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ চলছে। সাংবাদিকরা নিজেরাই নিজেদের শত্রু হয়ে উঠছে, যখন তারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্যও কোনো বিষয়ে এক হতে পারে না। অধ্যাপক ড. আবু সাইয়িদ গণতন্ত্রের প্রতি জোর দিয়ে বলেছেন, যে দেশে গণতন্ত্র থাকে না, সে দেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতাও থাকে না। আমাদের সংবিধানে বাকস্বাধীনতার কথা উল্লেখ থাকলেও কেউ সেটা মানছে না বরং গণমাধ্যমের উপর নিয়ন্ত্রণ এমন এক পর্যায়ে এসে ঠেকেছে যেখানে সত্য প্রকাশেই বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। সাংবাদিকের কলম স্বাধীন নয়, সেটি কাজ করছে উপরমহলের নির্দেশে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণে তিনি গণতন্ত্রের চর্চার উপর জোর দেন।
আমাদের নতুন সময়- এর প্রধান সম্পাদক নাঈমুল ইসলাম খান বলেন, বাংলাদেশের সংবাদপত্র এখন বহুমাত্রিক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। সাংবাদিকদের মধ্যে তদবির করার প্রবণতা এতটাই বেড়েছে যে সেটি এখন সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠানকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিচ্ছে। এই সংকটগুলো সমাধানের কোনো উদ্যোগও নেয়া হচ্ছে না। সংবাদপত্রে দুর্নীতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, হকারের কাছে দৈনিক ৪৫টি সংবাদপত্র দেয়া হলেও সাপ্লিমেন্ট দেয়া হয় ২০০-২৫০ এর মতো। মন্ত্রণালয়ে বার বার এই ধরনের দুর্নীতির কথা জানানো হলেও সরকারের তরফ থেকে কোনো প্রকার সাড়া পাওয়া যায় নি। স্বচ্ছতা আনায়নের লক্ষ্যে ই-টেন্ডারিং চালু করা হলেও এর ফলাফল হয়েছে উল্টো। দুর্নীতি নিরসনের বদলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সংবাদপত্র। এভাবে ক্রমান্বয়ে বাংলাদেশের সংবাদপত্রগুলোকে কোণঠাসা করে দেয়া হচ্ছে। টেলিভিশনের সংগঠনের সিদ্ধান্ত যখন কোনো টেলিভিশন অন্য কোনো মালিকের বিপক্ষে কোনো সংবাদ প্রচার করতে পারবে না, সেখানে গণমাধ্যম সামগ্রিকভাবে কীভাবে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে সেই বিষয়ে নাঈমুল ইসলাম খান সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। সাংবাদিকরা নিজেরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে চান কিনা এই বিষয়ে তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, সংবাদপত্রের নেতারা এখন বাণিজ্যমুখী। তাদের মধ্যে রয়েছে সততার অভাব। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে তিনি দুইটি প্রস্তাবনা রেখেছেন। প্রথমটি হলো, যারা কখনও কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে কাজ করেননি এমন স্বাধীন সাংবাদিকদের নিয়ে একটি পৃথক সংগঠন তৈরি করা এবং এই সংগঠন তৈরির উদ্দেশ্যে কলোকিয়ামের মতো উদ্যোগ নিয়ে সাংবাদিকদের মধ্যে অনুপ্রেরণা জোগানো।
আর্টিকেল নাইনটিন- এর দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক ফারুখ ফয়সল গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে গণতন্ত্রের বিকল্প নেই উল্লেখ করে বলেন গণমাধ্যমের দায়বদ্ধতা .
জনগণের কাছে। বিশ্বের উন্নত গণতন্ত্রের দেশগুলোতে যেখানে গণমাধ্যমের মালিকানার সীমাবদ্ধতা বিরাজমান সেখানে আমাদের দেশে ছত্রাকের মতো মালিকানা নিয়ে গণমাধ্যম বেড়েই চলেছে। এই বিষয়ে আলোচনার দরকার বলে তিনি আরও বলেন, আমাদের দেশে সাংবাদিকতার মান এতটাই কমে গিয়েছে যে সাংবাদিকরা এখন কার শত্রু-মিত্র সেটাও আলোচনার বিষয়। এই নিম্নমানের আরও কারণ হিসেবে তিনি বলেন, সাংবাদিক ইউনিয়ন এখন দুইভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছে। এই অচলাবস্থা দূর করতে তিনি মুক্ত আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টির প্রতি জোর দিয়েছেন।
দৈনিক দিনকাল- এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ড. রেজোয়ান সিদ্দীকি সরকার এবং আমলাতন্ত্রকে গণমাধ্যমের শত্রু হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, আমাদের দেশে বর্তমানে কোনো নিরপেক্ষ পত্রিকা নেই, কেননা প্রতিটি গণমাধ্যমই সরকারি বা সরকার দলীয়-বিরোধী দলীয় ব্যক্তিদের মালিকানাধীন। ফলে সরকারের ভুল-ত্রুটি সমূহ তুলে ধরতে তারা ব্যর্থ হয়। পত্রিকা হয়ে ওঠে একপেশে। এই গণমাধ্যমগুলো আমলাতান্ত্রিকতার সমর্থনে কাজ করে বলে তিনি জানান, যার ফলশ্রুতিতে সরকার নিজেরাই ক্ষতির সম্মুখীন হন। এই আমলাতান্ত্রিকতা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ করছে। তিনি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন- ২০১৮ – কে তুলনা করেছেন মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী স্পেশাল পাওয়ার এক্ট- এর সাথে, যেটির মাধ্যমে কেবল সাংবাদিকরাই ক্ষতিগ্রস্ত হতো। তিনি যোগ করেন, এই আইনসমূহের সীমাবদ্ধতা বেধে দেয়া উচিৎ। তিনি আরও বলেন, জনগণ গণমাধ্যমের মিত্র হতে পারতো, কিন্তু সঠিক গণতন্ত্রের চর্চা না থাকায় জনগণ তার কণ্ঠ প্রকাশ করতে পারে না। ফলে গণমাধ্যম হয়ে ওঠে বন্ধুহীন যা সরকারের জন্য অকল্যাণকর।
দি ফাইন্যান্সিয়াল হেরাল্ড- এর সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য হুমকিস্বরূপ আইনগুলোর কথা উল্লেখ করে বলেন, ১৯২৩ সালের অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট- এর খড়গ এখনো আমাদের গণমাধ্যমগুলোর মাথার উপর ঝুলছে, যেটি আমরা উপলব্ধি করি সাংবাদিক রোজিনা গ্রেফতারের পর। এছাড়া গণমাধ্যমের মালিকানা যাদের হাতে যাচ্ছে তারা কেউই সাংবাদিকতার সাথে সরাসরি যুক্ত নন, কেউ রাজনীতিবিদ, কেউ ব্যবসায়ী। এরা কেউ সাংবাদিকতাকে স্বাধীন হতে দিচ্ছে না। যিনি মালিক তিনিই হচ্ছেন সম্পাদক। সম্পাদক যোগ্যতার বিচারে না হয়ে, হচ্ছে ক্ষমতার বিচারে। মালিকানা টিকিয়ে রাখার জন্য গণমাধ্যমগুলোকে রীতিমতো যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হচ্ছে। যারা গণমাধ্যমের মালিকানা নিয়ন্ত্রণ করছেন, তারাই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ভঙ্গ করছেন, তারাই হচ্ছেন গণমাধ্যমের শত্রু।
সিজিএস- এর চেয়ারম্যান ড. মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরী গণতন্ত্রের শত্রুদের গণমাধ্যমের শত্রু বলে অভিহিত করেছেন। তিনি তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহারকে সংবাদপত্রগুলোর জন্য হুমকি হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকেই সবাই তড়িৎগতিতে সংবাদ পেয়ে যাচ্ছে। এমন প্রতিযোগিতার যুগে সংবাদপত্রের টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হওয়ার কারণে সরকারি বিজ্ঞাপনের পিছনে ছুটতে হচ্ছে গণমাধ্যমগুলোকে। এভাবে গণমাধ্যম তার স্বাধীনতা হারাচ্ছে।
News Courtesy: