অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের উপর জোর দিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা। গতকাল শনিবার রাজধানীর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল এন্ড স্ট্রাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) মিলনায়তনে এক সেমিনারে অংশ নিয়ে তারা এ তাগিদ দেন। সেন্টার ফর গর্ভনেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের নতুন মধ্যবিত্ত, গণতন্ত্র ও ধর্মের প্রশ্ন’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে রাজনৈতিক জবাবদিহিতা। আর এই জবাদিহিতা নিশ্চিতের প্রধান অনুসঙ্গ হচ্ছে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ।
মূল প্রবন্ধে আলী রীয়াজ বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক চালচিত্র বোঝার জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তনগুলোর দিকে মনযোগ দেয়া দরকার। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়া, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সততা, ভিন্নমত প্রকাশের স্পেস সংকুচিত হওয়াসহ বিভিন্ন ইস্যুতে মধ্যবিত্ত শ্রেণির যথেষ্ট উদ্বেগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। এটা ভাল গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান বলেন, সারা বিশ্বের নির্বাচনগুলোর দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সংখ্যালঘিষ্ঠ ভোট পেয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সরকার গঠন করছে। এতে করে সকল জনগণের সরকার হচ্ছে না। এধরণের সরকারের জন্য প্রয়োজন প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার। সেটার জন্য প্রয়োজন রেফারেন্ডাম এবং আনুপাতিক হারে নির্বাচনের ব্যবস্থা থাকতে হবে। এতে করে গণতন্ত্র আরও অনেক পূর্ণতা পাবে। তিনি বলেন, আমাদের এখানে প্রকৃতপক্ষে কোনো ধর্মীয় সংস্কার হয়নি। ধর্ম নিয়ে এই হৈ চৈ শুধু বাংলাদেশে না, পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও হচ্ছে। যত মুসলমান রাষ্ট্র আছে, শুধু মুসলমান না, খ্রিস্টান রাষ্ট্রগুলোতেও হচ্ছে। এটা দূর করা সম্ভব নয়।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বর্তমান বাস্তবতা হচ্ছে রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। আমরা বলি সবসময় গণ্ডগোল থাকে। অর্থনীতি এগোচ্ছে, রাজনীতি একটু দুর্বল। তিনি বলেন, রাজনীতিতে অংশগ্রহণে ছাত্র বা সাধারণ মানুষের অনীহা রয়েছে। একাত্তরের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক জবাবদিহিতা তৈরি একটা প্রয়োজনীয় মাধ্যম। আর এর অন্যতম হচ্ছে শর্ত একটা ইনক্লুসিভ ইলেকশন। নাহলে আমরা একটা দীর্ঘমেয়াদী বেসামরিক কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থায় ঢুকে যাব।
গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, আজ কোথাও কোনো মুক্তচিন্তা নেই। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে দেখছি আমরা বন্ধুশূন্য। আমরা কেন বন্ধুশূন্য হলাম। নেপাল, ভুটান, শ্রীলংকা আমাদের পাশে নেই। চীন, রাশিয়া আমাদের বন্ধু। তারাও পাশে নেই। প্রধানমন্ত্রী মানবতার অবতার। তার নেতৃত্বে বন্ধুশূন্য হবে কেন দেশ। এটা গবেষণার বিষয়।
সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আসলে সকলক্ষেত্রেই গণতান্ত্রিক চর্চা হওয়া দরকার। সেটা হলে আমাদেরকে হেফাজতের সঙ্গে লড়াই করতে হতো না। পরিস্থিতি এমন হতো না যে পরদিনই সরকারকে ফেলে দেয়া হবে। আসলে নানা ধরণের ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করেই আমাদের রাজনীতি করতে হয়।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ইনাম আহমেদ চৌধুরী বলেন, উপমহাদেশের রাজনীতিতে ধর্মীয় প্রভাব সবসময় ছিল। এরশাদের শাসনামলে যখন রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করা হয়েছিল তখন সেটা কোনো রাজনৈতিক দলের দাবি ছিল না। সেই থেকে বাংলাদেশের রাজনীতি ধর্মের বাইরে আসতে পারেনি।
সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী বলেন, যুক্তরাষ্ট্রও এখন রাজনীতিতে ধর্ম টেনে আনছে। ভারতে ছবি মুক্তির ইস্যুতেও ধর্ম জড়িয়ে পড়ছে। তাজমহল থাকবে কি থাকবে না সে প্রশ্নও উঠছে। তাহলে আমাদের দেশের রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার হবে না কেন? আসলে সারা পৃথিবীতেই এখন ধর্মীয় মৌলবাদের চর্চা বাড়ছে। এতে করে ক্ষমতায় যাওয়ার রাস্তা প্রশস্ত হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক বলেন, নির্বাচন নিয়ে জনগণের মধ্যে একটা নিস্পৃহভাব চলে এসেছে। এ অবস্থায় অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন কতটা ভাল গণতন্ত্রে উত্তরণের পথ হবে সেটা বলা কঠিন। বর্তমানে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে সংগ্রামী চেতনা নেই। তারা দলদাসে পরিণত হয়েছে।
মানবজমিন-এর প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী রাজনীতিতে ধর্মের প্রভাব প্রসঙ্গে বলেন, কি আর বলব। যে দলটি একটি সেক্যুলার ধ্যানধারণ নিয়ে চলত সে দলটি এখন ধর্মান্ধ হেফাজতকে নিয়ে টানাটানি করে।
গবেষক ও সাংবাদিক সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্রের দুর্বলতা, রাজনীতিতে ধর্মের প্রভাব কাটাতে বিদেশি বইপত্র, রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতামত নেওয়া খুব জরুরি নয়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের পেছনের যে চার নেতা শেরে বাংলা, সোহরাওয়ার্দী, ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু তাদের বক্তৃতা-বিবৃতিতে যে দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন সেসব গবেষণা করলেই চলবে। আমার ধারণা বাংলাদেশ যে গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে সেভাবেই এগিয়ে যাবে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)-এর সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ভিশন ২০২১ বা ২০৩০-এ সবে সমাধান না খুঁজে আমাদের সবাইকে ‘ব্যাক টু ভিশন একাত্তরে’ ফিরে যেতে হবে। তাহলেই বাংলাদেশ সেক্যুলার ও উদারনৈতিক রাষ্ট্রের দিকে এগিয়ে যাবে।
সিজিএস-এর নির্বাহী পরিচালক ও টেলিভিশন উপস্থাপক জিল্লুর রহমানের সঞ্চালনায় সেমিনারে আরও অংশ নেন সিজিএস-এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম আতাউর রহমান, যুক্তরাষ্ট্রের ব্ল্যাকহিলস স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. আহরার আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন সাদেকা হালিম, ব্রাক ইউনিভার্সিটির বিআইজিডি-এর হেড অব অপারেশন্স সরওয়ার জাহান চৌধুরী প্রমুখ।
News Courtesy: http://www.ittefaq.com.bd/print-edition/second-edition/2017/11/19/237503.html