বর্তমানে আঞ্চলিক বাণিজ্যে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। এ বাণিজ্য বাড়াতে কানেকটিভিটি বা যোগাযোগ উন্নয়ন জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়ানোর অনেক সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক বাণিজ্য সম্ভাবনাও আছে। এসব কাজে লাগাতে রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রয়োজন। বিশেষ করে চীন ও ভারতের সঙ্গে সমানতালে সুসম্পর্ক উন্নয়ন করার পরামর্শ দিয়েছেন বক্তারা।
গতকাল শনিবার রাজধানীর ইস্কাটনে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) সভাকক্ষে আয়োজিত সেমিনারে এসব কথা বলেন বক্তারা। ‘বাংলাদেশ ইন রিজিওনাল ট্রেড অ্যান্ড কানেকটিভিটি এ পলিটিকো-ইকনোমিক অ্যাসেসমেন্ট’ শীর্ষক সভার আয়োজন করে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। সিজিএস সভাপতি প্রফেসর আতাউর রহমানের সভাপতিত্বে সভায় সাবেক মন্ত্রী ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, সাবেক মন্ত্রী আ স ম আবদুর রবসহ আঞ্চলিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা বক্তব্য দেন। সিজিএস নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমানের সঞ্চালনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অর্থনীতিবিদ এম শহিদুল ইসলাম।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, আঞ্চলিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অংশ মাত্র ৫ শতাংশ। এই রফতানি বৃদ্ধির চেষ্টা চলছে। বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপাল (বিবিআইএন) সংযুক্তির জন্য ভুটান অনুস্বাক্ষর প্রক্রিয়া শেষ না করায় পিছিয়ে আছে। ভারত ও পাকিস্তান এই দু’দেশের কারণে সার্ক কার্যকর হয়নি। আঞ্চলিক যোগাযোগ বাস্তবায়নে ইতিবাচক কাজ করছে বাংলাদেশ। মন্ত্রী বলেন, দেশীয় শিল্পের সুরক্ষা দিতে আমদানি ও রফতানি নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। ভারত দুটি পণ্যে এন্টিডাম্পিং ও কাউন্টারভেইলিং শুল্ক ছাড়া সব পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়েছে। দেশটি তার পণ্য সুরক্ষার জন্য এ শুল্ক আরোপ করেছে। তিনি বলেন, আঞ্চলিক বাণিজ্য উন্নয়নে আরও উদার হতে হবে।
কামাল ইবনে ইউসুফ বলেন, কঠিন শর্তে ভারতীয় ঋণ যথার্থ নয়। আঞ্চলিক যোগাযোগ উন্নয়ন কেবল পরিবহনে নয়, সবক্ষেত্রে হতে হবে। তিনি বলেন, এখন ভারতে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অশুল্ক বাধা বড় প্রতিবন্ধকতা। এখন ভারতের বাজারে পণ্য প্রবেশ খুব একটা সহজ নয়। এ জন্য বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও মিয়ানমার ইকোনমিক করিডোর (বিসিআইএমইসি) এবং বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টিসেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনের (বিমসটেক) কার্যকর করতে হবে। ভৌগোলিক দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান অনুযায়ী সিল্করুট খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।
আ স ম আবদুর রব বলেন, বাণিজ্য বাড়াতে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোট তৈরি করতে হবে। আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক যোগাযোগ উন্নয়নের মাধ্যমে এগোতে হবে। এ জন্য গভীর সমুদ্রবন্দর দ্রুত স্থাপন করতে হবে। পরে উদ্যোগ নিয়েও মিয়ানমারে গভীর সমুদ্রবন্দর হয়েছে অথচ দেশে হয়নি। তিনি বলেন, বাণিজ্য উন্নয়নে অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার পাশাপাশি আঞ্চলিক রাজনৈতিক ঐকমত্য না হলে কিছু হবে না।
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা জাফরুল্লাহ্ চৌধুরী বলেন, দেশের অর্থনীতির জন্য অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। দেশে কার্যকর বিরোধী দল, সুশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি_ সব কিছুর ওপর বাণিজ্য নির্ভর করছে। দেশের পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন, আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে যোগাযোগ উন্নয়ন জরুরি। সবকিছুর ঊধর্ে্ব আঞ্চলিক বাণিজ্য সমস্যা সমাধান করতে হবে। তিনি বলেন, আঞ্চলিক যোগাযোগ উন্নয়নে সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আস্থার যে ঘাটতি আছে, তা দূর করতে হবে।
এনবিআরএন সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, বাণিজ্য ও যোগাযোগের সমন্বিত উন্নয়নের পাশাপাশি সমতাভিত্তিক উন্নয়ন করতে হবে। শক্তিশালী রাজনৈতিক সমর্থন ছাড়া আঞ্চলিক বাণিজ্যে দেশ ভালো করতে পারবে না।
ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আসিফ ইব্রাহীম বলেন, বিসিআইএম করিডোরের মাধ্যমে অনেক সম্ভাবনা আছে। এটা বাস্তবায়ন করা গেলে আঞ্চলিক বাণিজ্যে অশুল্ক বাধা দূর করা সম্ভব হবে। দেশের অর্থনীতির জন্য বড় রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতা দরকার। রাষ্ট্রের স্বার্থে ঐকমত্যে পেঁৗছতে হবে।
বিআইআইএসএস সভাপতি সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমেদ বলেন, বর্তমানে আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্য খুবই সীমিত। এটি বাড়াতে উদ্যোগ নিতে হবে। ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে হবে। এই দু’দেশের মধ্য দিয়ে অন্য দেশে যেতে হবে।
অর্থনীতিবিদ মামুনুর রশিদ বলেন, বন্দরগুলো ঠিক করা না গেলে বাণিজ্য ভালো হবে না। আগে দেশের সক্ষমত বাড়াতে হবে।
দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, বাণিজ্য প্রসারে আঞ্চলিক যোগাযোগ উন্নয়ন করা জরুরি। তবে বাণিজ্য সহযোগিতা উন্নয়নের চেয়ে বিনিয়োগে বেশি জোর দিতে হবে।
News Courtesy: http://bangla.samakal.net/2017/08/20/318356