কাগজ প্রতিবেদক : বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা একই সঙ্গে মজার ও জটিল আখ্যা দিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেন, গরু চোরাচালানের জন্য সীমান্তে প্রতিনিয়ত হত্যাকাণ্ড হয়, কিন্তু রহস্যজনক কারণে ওই একই সীমান্ত দিয়ে মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানের ঘটনায় কোনো গোলাগুলি হয় না।
সেন্টার ফর গভার্নেন্স (সিজিএস)-এর আয়োজনে রাজধানীর ইস্কাটনে বিআইআইএস মিলনায়তনে ‘আন্তঃসীমান্ত নিরাপত্তা : সমস্যা ও সহযোগিতা, পরিপ্রেক্ষিত বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারে তারা উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা একই সঙ্গে মজাদার এবং জটিল বিষয়।
সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সবাই বলে ভারত বিভক্ত হয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বিভক্ত হয়েছে বাংলা এবং পাঞ্জাব। তিনি বলেন, রাজনীতির বাইরে গিয়ে বললে বলতে হবে, দুদেশের মধ্যে সীমান্ত ও কাঁটাতারের বেড়া থাকলেও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক ও যাতায়াত অব্যাহত। তাই সীমান্ত ব্যবস্থাপনাটাও খুবই কঠিন।
সাবেক এই ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বলেন, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের শতকরা ৯৫ ভাগ সদস্যেরই বাংলার সামাজিক কাঠামো সম্পর্কে কোনো রকম ধারণা নেই। তারা রাজস্থান, গুজরাট ও উত্তর ভারতের বাসিন্দা। তাদের (বিএসএফ সদস্যদের) বদ্ধমূল ধারণা, এই এলাকার মানুষ সব খারাপ।
সাখাওয়াত হোসেন বলেন, এটা পুরোপুরি একটা মানসিক সমস্যা। পশ্চিমবঙ্গের মানুষের সঙ্গেও তারা একই আচরণ করে। এ জন্য মমতা ব্যানার্জীও মাঝেমধ্যে ক্ষেপে যান। গরু সরবরাহ বন্ধ করার ব্যাপারে ভারতের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, ‘গরু সরবরাহ বন্ধ করে ভারত ভালো করেছে। আমরাও গরু চাই না এবং গরু আনা বন্ধ হোক। আমরা যদি ছয় মাস গরু আনা বন্ধ করি তাহলে ভারতে আন্দোলন শুরু হবে। তাদের চামড়াশিল্পে ধস নামবে। অপরদিকে আমাদের দেশের মানুষও আর গুলি খেয়ে মরবে না। মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আলাদা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মিয়ানমারের সঙ্গে আমাদের একমাত্র সমস্যা রোহিঙ্গা।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সাবেক মহাপরিচালক লে. জে. মো. মঈনুল ইসলাম বলেন, গরু চোরাচালানের জন্য সীমান্তে প্রতিনিয়ত হত্যাকাণ্ড হয়, কিন্তু রহস্যজনক কারণে ওই একই সীমান্ত দিয়ে মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানের ঘটনায় কোনো গোলাগুলি হয় না।
শুধু আমাদের বাংলাদেশিরাই কেন গরুসহ চোরাচালানের ঘটনায় হত্যাকাণ্ডের স্বীকার হয় তার কারণ ব্যাখ্যা করে সাবেক এই বিজিবি প্রধান বলেন, ‘আসলে গরুসহ চোরাচালানের কোনো পণ্যই তারা (ভারতীয়রা) দিয়ে যায় না। আমাদের বাংলাদেশের মানুষ ভারতে গিয়ে নিয়ে আসে।’
তিনি বলেন, ‘যখনই অর্থনৈতিক লেনদেন বা হিসাবের ক্ষেত্রে গরমিল হয় তখনই গোলাগুলি বা প্রাণহানির মতো ঘটনা ঘটে। আমাদের মনে রাখতে হবে, কেউ-ই ধোয়া তুলসী পাতা নয়।’
জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সীমান্ত এলাকার বাংলাদেশিরা চোরাচালানের মতো অবৈধ কাজে সম্পৃক্ত হওয়ার জন্য দেশের আইন, ব্যবস্থাপনা এবং রাষ্ট্রীয় বিধি-নিষেধের কথা উল্লেখ করেন বিজিবির এই সাবেক প্রধান।
তিনি বলেন, ‘আমাদের সীমান্ত এলাকার মানুষের দর্শন ভিন্নরকম। কারণ, সীমান্ত এলাকায় কোনো উন্নয়ন হয় না। সীমান্তের পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে যাদের বসবাস, চাকরির বেলায় তাদের সুযোগ সীমিত। ওই এলাকার মানুষকে স্পর্শকাতর কোনো এলাকায় পোস্টিং দেয়া হয় না। সে কারণে বাধ্য হয়ে বা বাস্তবতার কারণে তারা এসব করে।
তিনি বলেন, সীমান্ত দিয়ে ট্রাকের পর ট্রাক বিস্ফোরক আসে, কিন্তু আতঙ্কের কারণে তল্লাশি ছাড়াই তা ছেড়ে দেয়া হয়। ওইসব পণ্য কোথায় খালাস হয় বা ওইসব ট্রাকে আসলে কী ছিল তা যাচাই করা হয় না।
দৈনিক মানব জমিন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, ১৯৭১ সালের পর বাংলাদেশে আর কখনো জাতীয় ঐক্য হয়নি। ভারত তাদের স্বার্থ দেখবে এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু আমরা দেখি না।
তিনি বলেন, কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে সম্পর্ক হয় না। ভারতও আমাদের সন্দেহ করে, আমরাও করি। দু’দেশের জঙ্গি ও সন্ত্রাসীরা দু’দেশেই যাতায়াত করছে।
সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দীলিপ বড়–য়া বলেন, ভারতের আর চাওয়ার কিছু নেই, আমরা সবই দিয়ে দিয়েছি। এমনকী অনুপ চেটিয়াকেও দিয়ে দিয়েছি। কিন্তু তারা কিছুই দিচ্ছে না।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শাহাব এনাম খান। তিনি তার প্রবন্ধে পানিবণ্টন, নদী ব্যবস্থাপনা, ট্রানজিট, চোরাচালান, সীমান্তে হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোকপাত করেন। সেমিনারে সঞ্চালক ছিলেন সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমান।
অধ্যাপক এম আতাউর রহমানের সভাপতিত্বে আলোচনায় আরো অংশগ্রহণ করেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহিম, সাবেক রাষ্ট্রদূত ওয়ালিউর রহমান প্রমুখ।
News Courtesy: http://www.bhorerkagoj.net/print-edition/2017/08/14/161472.php