রাজনীতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরলে গুম-খুনের ঘটনা বন্ধ হবে। গুম বন্ধ করতে আগের ঘটনাগুলোর বিচার শুরু করা জরুরি বলেও মনে করছেন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা। গতকাল বৃহস্পতিবার সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘জোরপূর্বক নিখোঁজ এবং রাষ্ট্রের দায়’ শীর্ষক ওয়েবিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমানের সঞ্চালনায় ওয়েবিনারে সভাপতিত্ব করেন সংস্থার চেয়ারম্যান ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরী।
ওয়েবিনারে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য অসীম কুমার উকিল বলেন, কোনো ক্ষেত্রেই গুম-খুনের ঘটনা কাক্সিক্ষত হতে পারে না। গণতন্ত্রের ধারাগুলো যত বেশি শক্তিশালী হবে রাজনীতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া তত সহজ হবে। তিনি বলেন, গণতন্ত্রের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলো নির্বাচন। নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে। রাজনৈতিক নেতাদের গুম হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, রাজনৈতিক মাঠের একজন কর্মী হিসেবে মনে করি, এটি কাক্সিক্ষত নয়, এটি হতে পারে না। যে কারণেই এগুলো হোক না কেন, বন্ধ হওয়া দরকার। এগুলো সবাই মিলে বন্ধ করা দরকার।
গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের প্ল্যাটফরম ‘মায়ের ডাক’ প্রসঙ্গে অসীম উকিল বলেন, এটা মায়ের ডাক হবে কেন? এটা দেশের ডাক, এটা সবার ডাক। মায়ের ওপর সব দায় চাপিয়ে দিয়ে নিজেদের আড়াল করছি কিনা, সেটা দেখা দরকার। দায়িত্বটা আমাদের, যারা দেশ পরিচালনা করছেন, যারা করেছেন এবং যারা করতে চান। বিএনপির সংসদ সদস্য
হারুনুর রশীদ বলেন, যারা গুমের শিকার হচ্ছেন তারা আইনের আশ্রয় পাচ্ছেন না। কোথাও অভিযোগ করা যাচ্ছে না। দায়িত্বশীলদের জবাবদিহির ঘাটতি রাজনীতিতে ছন্দপতন ঘটাচ্ছে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হলে, রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে যারা আছেন তারা দায় নিলে এসব ঘটনা বন্ধ হয়ে যেত। এ সময় তিনি গুম হওয়া কয়েকজনের স্বজনের দুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরে বলেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গুম হওয়া মানুষজনের স্বজনদের মিথ্যা মামলায় অভিযুক্ত করা হয়। যাতে তারা মুখ খুলতে না পারে।
সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যার পেছনে জড়িত যারা বেঁচে আছে, আজ না হোক ৩০ বছর পর তাদের বিচার হবে। লাতিন আমেরিকার ৭০ দশকের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর বিচার হচ্ছে। বাংলাদেশেও এগুলোর বিচার হবে। যারা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছেন তারাও কাঠগড়ায় দাঁড় হবেন। এত বড় অন্যায় করে যারা বুক ফুলিয়ে আছেন, এই সমাজকে টিকে থাকতে হলে তাদের বিচার হতেই হবে। এসব ঘটনার বিচার না হলে সমাজ টিকে থাকতে পারে না।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) মহাসচিব নূর খান লিটন গুমের কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, সংক্ষিপ্ত পথে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ, সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জন, বিরোধী মত দমন- এই তিন উদ্দেশ্যে গুম-খুনসহ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাÐ ঘটানো হয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে দায় না এড়িয়ে এই ধরনের অপরাধ কারা করেছে তা স্পষ্ট করা। এসব ঘটনার জন্য পুরো বাহিনীকে দোষারোপ করছি না। কিন্তু অনেকের নাম চলে আসবে। যারা ফিরে এসেছেন তাদের বর্ণনা আমরা শুনেছি। তারা যে বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে রাষ্ট্র চলতে পারে না।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, নাগরিক সমাজ আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে বিভক্ত হয়ে গেছে। এখন আমাদের দল বা ব্যক্তির কথা না বলে গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থা বদলে দেওয়ার কথা বলতে হবে। সিজিএস সভাপতি ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, গুম-খুন সবই রাজনৈতিক ঘটনা নয়। টাকার জন্যও অনেক ঘটনা ঘটছে। রাজনীতিবিদরা এগুলো স্বীকার করছেন না। ২০১৪ সালে ও ২০১৮ সালে নির্বাচনের আগে গুম-খুন বেশি হয়েছে। কারণ যেন নির্বাচনে লোকজন না দাঁড়ায়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব এগুলো প্রতিহত করা। নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে না। নিজেদের এগিয়ে আসতে হবে। স্বচ্ছ ও শক্তিশালী মানবাধিকার কমিশন গঠন করে দোষীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।
News Courtesy:

