Centre for Governance Studies, Dhaka

CGS in the media

ভারতের কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকা উচিত নয়

Press clipping reproduced from the original publication, as archived on the CGS website.

চিরন্তন কৃতজ্ঞতাবোধ পৃথিবীর কোথাও নেইÑ এমন মন্তব্য করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান বলেছেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জয়লাভে অবদানের জন্য ভারতের কাছে আমরা অবশ্যই কৃতজ্ঞ। কিন্তু তাদের কাছে আমাদের চিরকৃতজ্ঞ থাকা উচিত নয়। তিনি বলেন, এ কথা কিন্তু ১৯৭১ সালে শোনা যেত না, সম্প্রতি উঠেছে। আমি এর সোজা জবাব দিতে চাই। ভারতও জানে, বাংলাদেশও জানে যে চিরন্তন কৃতজ্ঞতা বোধ পৃথিবীর কোথাও নেই। এটা ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব নয়। এটা জাতির সাথে জাতির, রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের বন্ধুত্ব। রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের বন্ধুত্ব তখনই হবে যখন আমাদের স্বার্থ অভিন্ন হবে। আর যদি স্বার্থের ক্ষেত্রে সঙ্ঘাত থাকে, তাহলে চিরন্তন কৃতজ্ঞতাবোধ কোনো দিনই হবে না।

বাংলাদেশের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। সিজিএসের চেয়ারম্যান মনজুর আহমেদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব:) জাফর ইমাম বীরবিক্রম, মেজর জেনারেল (অব:) হেলাল মোর্শেদ খান বীরবিক্রম ও মেজর জেনারেল (অব:) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক। স্বাগত বক্তব্য পাঠ করেন সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমান।

আকবর আলি খান বলেন, ১৯৭১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে আমার দেখা হয়েছিল, প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সাথেও দেখা হয়েছিল। তারা স্পষ্টভাবে বলেছেন, তোমরা স্বাধীনভাবে বাঁচ সেটাই আমরা চাই। তারাও কখনো কল্পনা করেনি যে বাংলাদেশ কারো কাছে চির পদানত হয়ে থাকবে। যারা এ ধরনের চিন্তা করেন তারা কল্পনার জগতে বাস করছেন।

তিনি আরো বলেন, দেশের সংবিধানে চারটি মূল ভিত্তি রয়েছে। এর মধ্যে জাতীয়তাবাদ বাংলাদেশে চূড়ান্তভাবে অর্জিত হয়েছে, এটা নিয়ে চিন্তার কারণ নেই। কারণ ভারত যদি বাংলাদেশকে নিতে চায় তাহলে তাদের সর্বনাশ হবে। আর পাকিস্তানও এখন আর বাংলাদেশকে নিতে চাইবে না। কিন্তু চিন্তার কারণ হলো গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ নিয়ে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আমরা বিশ্বাস করি উদারনৈতিক গণতন্ত্রে। এ গণতন্ত্রে শুধু নির্বাচন হলেই চলবে না, অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকতে হবে, সেখানে নাগরিক সমাজের ভূমিকা থাকতে হবে, আইনের শাসন থাকতে হবে। কিন্তু দেশে এগুলোর এখনো অভাব রয়েছে। গণতন্ত্র সুসংহত করতে চাইলে সুশাসন থাকতে হবে। সুশাসন না থাকলে মানুষের অধিকারও নিশ্চিত হবে না। বিদেশী বিনিয়োগও হবে না। অর্থনৈতিক উন্নতি ব্যাহত হবে। রাজনৈতিক অধিকারও খর্ব হবে। এতে মানুষের অধিকার লঙ্ঘিত হবে। সে জন্য আগে সব রাজনৈতিক দলকে গণতন্ত্রে বিশ্বাস করতে হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো, বাংলাদেশে অনেক রাজনৈতিক দল রয়েছে, তারা মুখে গণতন্ত্রের কথা বলে, কিন্তু আসলে তারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না। দেশে গণতন্ত্র না থাকলে ধর্মনিরপেক্ষতা টেকসই হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আকবর আলি খান বলেন, আমরা সমাজতন্ত্রকে লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমাজতন্ত্রের যে স্বপ্ন রয়েছে, তা হলো মানুষে মানুষে বিভেদ কমানো। কিন্তু দেশে মানুষে মানুষে বিভেদ বেড়ে চলেছে। যেসব হিসাব আমাদের কাছে আছে তাতে দেখা যাচ্ছে, প্রায় ৬৫ ভাগ দেশে বাংলাদেশের চেয়ে আয়ের বৈষম্য কম। বাংলাদেশে যে ধরনের বৈষম্য রয়েছে, এ ধরনের বৈষম্য মাত্র ৩৩ শতাংশ দেশে রয়েছে। এ বৈষম্য বেড়েছে গত ২৫ থেকে ৩০ বছরে। এর একটা কারণ হলো দেশে প্রচণ্ড দুর্নীতি হচ্ছে। কালো টাকা ও সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় বৈষম্য বেড়েই চলেছে। এটি রোধ করতে না পারলে দেশে আবার গণ্ডগোল দেখা দেবে। আমরা যদি শান্তি চাই তাহলে এ বিষয়ে দৃষ্টি দিতে হবে।

মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি জনযুদ্ধ উল্লেখ করে সরকারের সাবেক সচিব আকবর আলি খান বলেন, মুক্তিযুদ্ধে সৈনিক, কৃষক, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সর্বস্তরের মানুষ অংশগ্রহণ করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের ৭০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে ছিল। আজকে ২০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে রয়েছে, এটা অকল্পনীয় অর্জন। তবে আন্তর্জাতিকভাবে চিন্তা করলে দেখা যায় বর্তমানে শুধু বাংলাদেশেই নয়, পৃথিবীর সব দেশেই দারিদ্র্য কমেছে। সে হিসেবে বাংলাদেশের ৪০-৪৫ ভাগ মানুষ এখনো দারিদ্র সীমার নিচে রয়েছে। কিন্তু এ হিসেবেও ভুল রয়েছে। কারণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে মানুষের চাহিদাও বেড়েছে। সে হিসেবে দেশে এখনো ব্যাপক দারিদ্র্য রয়েছে। এ ব্যাপারে সতর্ক থাকা দরকার জানিয়ে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন সমানভাবে হয়নি এজন্য এটি যেকোনো সময় পড়েও যেতে পারে।

আকবর আলি খান বলেন, ‘১৯৭১ সালের তুলনায় এখন আমাদের দেশে খাদ্য সরবরাহ অনেক ভালো। কিন্তু খাবার হজম করার জন্য সুপেয় পানি প্রয়োজন। সরকার খুব ঢাকঢোল পিটিয়ে বলছে, বাংলাদেশে নাকি ৯৭ ভাগ লোক সুপেয় পানি পাচ্ছে। কিন্তু আমি তা দেখি না। আর্সেনিক ও উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ততা বিবেচনায় নিলে দেশের ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশের বেশি লোক সুপেয় পানি পাচ্ছে না। লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব:) জাফর ইমাম বীরবিক্রম বলেন, গত ৫০ বছরে দেশের প্রাপ্তি শূণ্যের কোঠায়। বরং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এখন হুমকির মুখে। শুধু উল্লাস করলেই চেতনা হয় না। উন্নয়ন দিয়ে চেতনা ধরে রাখা যাবে না, বরং চেতনা দিয়ে উন্নয়ন ধরে রাখতে হবে। বিদেশী লেখকরা মুক্তিযুদ্ধকে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ লিখছে জানিয়ে তিনি বলেন, এসব বই ভুলে ভরা। দেশে কি কোনো গবেষক নেই? বিদেশ থেকে আনতে হবে কেন? মুক্তিযুদ্ধে ছাত্র, শিশু-কিশোর থেকে মা- বোনেরা দা, কুড়াল ও বাঁশের লাঠি নিয়ে যুদ্ধে নেমেছিল বলেও জানান তিনি।

মেজর জেনারেল (অব:) হেলাল মোর্শেদ খান বীরবিক্রম বলেন, পাশের দেশের চেয়ে বাংলাদেশ বেশি ধর্মনিরপেক্ষ। তবে গণতন্ত্রের ঘাটতি রয়েছে। গণতন্ত্রের আন্তর্জাতিক যে মাত্রা রয়েছে সেখানে আমাদের পৌঁছাতে হবে। ক্ষমতাসীন সরকারকে ঘায়েল করা বিরোধী দলের রাজনৈতিক সংস্কৃতি উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার যদি বিএনপির দাবি নিরপেক্ষ সরকার মেনে নেয়, তাহলে আগের মতো সাথে সাথে তারা যেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা না করে। একইভাবে আওয়ামী লীগও যেন লগি-বৈঠা নিয়ে মাঠে না নামে। এ ধরনের মানসিকতা পরিহার করতে হবে।

স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডারদের ডাকা হয়নি বলে অভিযোগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন মেজর জেনারেল (অব:) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বলে দাবি করা হয়। এ নিয়ে ভারতে সিনেমাও বানানো হয়েছে। তিনি এর প্রতিবাদ জানান। বীরপ্রতীক ইবরাহিম বলেন, মুক্তিযুদ্ধ কোনো এক ব্যক্তি, একটি দলের ছিল না। এ যুদ্ধে পুরো দেশের মানুষের কমবেশি অবদান ছিল। তিনি আরো বলেন, মুক্তিযুদ্ধে ভারত যে সহায়তা করেছে অবশ্যই তা স্বীকার করতে হবে, কিন্তু কৃতজ্ঞ থাকারও সীমা থাকতে হবে।

আলোচনা শেষে অতিথিরা ‘বাংলাদেশের ৫০ বছর’ শীর্ষক রচনা প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার তুলে দেন।

News Courtesy:

https://www.dailynayadiganta.com/first-page/630909/%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%A4%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%9B%E0%A7%87-%E0%A6%9A%E0%A6%BF%E0%A6%B0%E0%A6%95%E0%A7%83%E0%A6%A4%E0%A6%9C%E0%A7%8D%E0%A6%9E-%E0%A6%A5%E0%A6%BE%E0%A6%95%E0%A6%BE-%E0%A6%89%E0%A6%9A%E0%A6%BF%E0%A6%A4-%E0%A6%A8%E0%A7%9F?fbclid=IwAR11gsLkdG2SJVGA4zXltJ48ltwTYdt4d5PfjUf6FHy3hSVXKuXWwWnoV0Y