Centre for Governance Studies, Dhaka

CGS in the media

বাজেটের কিছু এরিয়ায় পলিশ করা প্রয়োজন

Press clipping reproduced from the original publication, as archived on the CGS website.

অর্থনৈতিক পরিবর্তনের গিয়ার হলো বাজেট। হাই গিয়ারে যাবে, নাকি লো গিয়ারে যাবে, নাকি নিউট্রালি বসে থাকবে তা ঠিক করার অধিকার সরকারের আছে। ব্যবসায়ীরাও বলছেন বাজেট ব্যবসাবান্ধব হয়েছে। তবে বাজেটের কিছু এরিয়া পলিশ করার প্রয়োজন আছে বলে মন্তব্য করেছেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। তিনি বলেন, বাজেটের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো বিগত বছরগুলোতে যে মোমেন্টাম আমরা অর্জন করেছি তা ধরে রাখা। আর অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অর্থনীতিতে বৈষম্য বাড়ছে। ফলে পুনরুদ্ধারের গতিপথ ব্যাহত হচ্ছে। সম্পদ চলে যাচ্ছে এক শ্রেণীর মানুষের হাতে। প্রান্তিক হয়ে পড়ছে অপর শ্রেণী। সব ব্যবসায়ীর জন্য এই বাজেট ব্যবসাবান্ধব নয়। এই বাজেট থেকে সাধারণ জনগণ কিভাবে উপকৃত হবে সেটিও প্রশ্নবিদ্ধ।

সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত বাংলাদেশ কি বৈষম্যমূলক পুনরুদ্ধারের পথে? শীর্ষক গতকাল এক ওয়েবিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনামন্ত্রী এসব কথা বলেন। বাজেট ২০২১-২০২২ অর্থ বাজেটকে সামনে রেখে আয়োজিত অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজের (সিজিএস) চেয়ারম্যান ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ, অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ পারভেজ ইমদাদ, বিসিআইর সাবেক সভাপতি ও এফবিসিসিআইর সাবেক পরিচালক শাহেদুল ইসলাম হেলাল, বারভিডার প্রেসিডেন্ট ও ঢাকাস্থ জাপানিজ ইনভেস্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের বিশেষ উপদেষ্টা মো: আব্দুল হক এবং ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পারভেজ করিম আব্বাসী। ওয়েবিনারটির সঞ্চালনায় ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমান।

পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা অর্থমন্ত্রীও সেরা বাজেট দিতে পারেন না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্থনীতির যে মডেলে আমরা এগোচ্ছি তাতে উই আর রাইট অন দ্য মিডল অব দ্য রাইট ট্র্যাক। তিনি বলেন, বিগত ১২ বছরে আমরা একটি চমৎকার পথরেখা দিয়ে এসেছি। আমাদের মূল দায়িত্ব ছিল বাঙালিকে ঘরে ফিরিয়ে আনা, আস্থা দিয়ে বসবাস করানো। পেটে-ভাতে, জলে পানিতে, আলো-বাতাসে পৃথিবীর অন্যান্য মানুষের মতো ভদ্রভাবে বাস করার সেরকম একটি সুযোগ তৈরি করা। আমরা বোধ হয় সে পথে আছি। যদিও আমি স্বীকার করব যে গতিতে আমরা আশা করেছিলাম সে গতিতে আমরা পারিনি।

এম এ মান্নান বলেন, আওয়ামী লীগ অন্য রাজনৈতিক দলের মতো শুধু একটি রাজনৈতিক দল নয়, এটি একটি রাজনৈতিক আন্দোলন। এর মূল উদ্দেশ্য মানুষের বিকাশ। বিকাশের অর্থ উন্নয়ন। তিনি বলেন, এই সরকার দেশের সবার ঘরে ঘরে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করেছে। বাংলাদেশের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ গ্রামে বাস করে। এই গ্রামকেই অবহেলা করা হতো একসময়। এই গ্রামের মানুষের উন্নয়নে কাজ করেছে সরকার, যেটি পূর্বে সম্ভব ছিল না। তিনি বলেন, লক্ষ্য পূরণে অটল থেকে কাজ করে যাচ্ছে সরকার।

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট প্রণয়নকে দেখেছেন রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মুক্তবাজার অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছে। বাজেটের বরাদ্দ হয়ে পড়েছে গোষ্ঠীতান্ত্রিক। যার ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বাজার মূল্য ধারণাটির অধঃপতন হয়েছে। এই বাজার মূল্য নিয়ন্ত্রণ করে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী। বাংলাদেশে একটি নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক মডেল দাঁড়িয়ে গিয়েছে। তিনি বলেন, যেখানে সম্পদ কেবল এক শতাংশ মানুষের হাতে পুঞ্জীভূত হবে এবং দেশে সুষ্ঠু ভোটের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত এই অবস্থা চলমান থাকবে।

মহামারীকালীন মানুষের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরে ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর প্রবন্ধে বলেন, চলতি বছরেই বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যয় সবচেয়ে সঙ্কুচিত হয়েছে। অর্থনীতিতে বৈষম্য বাড়ছে। ফলে পুনরুদ্ধারের গতিপথ ব্যাহত হচ্ছে। সম্পদ চলে যাচ্ছে এক শ্রেণীর মানুষের হাতে। প্রান্তিক হয়ে পড়ছে অপর শ্রেণী। তিনি বলেন, করোনায় বাংলাদেশে বেকারত্ব, দারিদ্র্য, বৈষম্য বেড়েছে। বিনিয়োগ স্থবিরতার মুখে পড়েছে। এই সঙ্কট উত্তরণে সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে তিনি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সঙ্কট উত্তরণে সঠিক নীতিনির্ধারণ করতে ব্যর্থ হলে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে। ক্ষুদ্র এবং মাঝারি ধরনের শিল্পে সবচেয়ে বেশি মানুষের অন্তর্ভুক্তি থাকলেও এই খাতে বরাদ্দকৃত অধিকাংশ অর্থই মানুষের কাছে এসে পৌঁছায় না। এমনকি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বরাদ্দ ১৩ শতাংশ বাড়লেও মাথাপিছু ভাতার পরিমাণ কমিয়ে দেয়া হয়েছে। গোষ্ঠীস্বার্থ চিন্তা না করে সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বার্থ চিন্তা করলেই বৈষম্যমূলক অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। স্বাস্থ্য এবং শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বিগত বছরের চেয়ে কম বলে তিনি উল্লেখ করেন। বাংলাদেশ এক শিল্পনির্ভর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হওয়ার কারণে করোনায় অভিঘাত বেশি উপলব্ধি হয়েছে। তিনি বলেন, বাজেটে বিনিয়োগের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো নীতি চোখে পড়েনি। দেশে আয় থাকলেও নতুন বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই। যার ফলে ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের যে আশা ছিল, তা সঙ্কটের মুখে পড়ছে।

বাজেটে তিনটি ধাপের কথা উল্লেখ করে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বাজেট প্রণয়ন, বাজেট পরবর্তী আলোচনা এবং বাজেট বাস্তবায়ন। তিনি বলেন, বাজেট যেহেতু জনগণের স্বার্থে প্রণয়ন করা হয়, সেহেতু জনগণের সাথে আলোচনা করে, জনপ্রতিনিধিদের সাথে আলোচনা করে বাজেট প্রণয়ন করা সমীচীন। অথচ বাংলাদেশে বাজেট নিয়ে আলোচনা করা হয় পেশাজীবীদের সাথে, ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সাথে। ফলে বাজেট হয় পুরনো অর্থবছরের বাজেটের ধারাবাহিকতা মাত্র। তিনি বলেন, বাজেট প্রস্তাবিত হওয়ার পরেও বাজেট নিয়ে মুক্ত আলোচনার সুযোগ থাকে না। এই দুই ধাপের দুর্বলতার ফলাফল হিসেবে বাজেট বাস্তবায়নেও জবাবদিহিতা এবং স্বচ্ছতার অভাব থেকে যায়। তিনি বাজেটকে ব্যবসাবান্ধব হিসেবে উল্লেখ করলেও বলেন, সব ব্যবসায়ীর জন্য এই বাজেট ব্যবসাবান্ধব নয়। এই বাজেট থেকে সাধারণ জনগণ কিভাবে উপকৃত হবে সেটিও প্রশ্নবিদ্ধ।

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, সঠিক তথ্য-উপাত্তের সাহায্যে বাস্তবতাভিত্তিক অবস্থানে আসতে হবে আমাদের। অন্যান্য বক্তার সাথে একমত পোষণ করে তিনি কর ব্যবস্থাপনাকে প্রগতিশীল করার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আমাদের দেশের অর্থনীতিতে বিভাজন ব্যবস্থা রয়ে গিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে করপোরেট করের হার কমানোর অর্থ হচ্ছে দেশের অর্থনীতিকে আরো বিভাজনের দিকে ঠেলে দেয়া। জনগণের অন্তর্ভুক্তির উপর জোর দিয়ে তিনি জনবল বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন।

ড. মোহাম্মদ পারভেজ ইমদাদ বলেন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা এবং মহামারীর সময়ে রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়ে সরকারের অর্জন আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতাকেই নির্দেশ করে। বিশেষভাবে স্বাস্থ্যখাতে স্বাস্থ্য অবকাঠামো এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নজর দেয়ার কথা উল্লেখ করেন তিনি। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যখাতে নজরদারি এবং নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর সাথে সমন্বয় করে কাজ করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বাজেটকে কর্মক্ষমতা-নির্ভর বাজেটে রূপান্তর করার কথা বলেন। তিনি বলেন, যেখানে সীমাবদ্ধতাগুলোকে শক্তিতে পরিণত করতে হবে।

শাহেদুল ইসলাম হেলাল বলেন, কর ব্যবস্থাকে সাধারণীকরণ করতে হবে। তার মতে, প্রস্তাবিত বাজেটে বড় শিল্পের কর প্রদানের ক্ষেত্রে যে ধরনের সুবিধা রাখা হয়েছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ধরনের শিল্প সেসকল সুবিধা থেকে বঞ্চিত। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে যারা কাজ করেন তাদেরকে কর আওতামুক্ত রাখার পরামর্শ দেন তিনি। তিনি বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য বর্তমান তরুণ সমাজে জন্য একটি বড় উদ্বেগের জায়গা। যদি দেশের তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা না যায়, তবে দেশ ভবিষ্যতে ভালো ব্যবসায়ী উদ্যোক্তা থেকে বঞ্চিত হবে।

আব্দুল হক বলেন, দেশে জবাবদিহিতা এবং শলা-পরামর্শের সুযোগ যত বিস্তৃত হবে দেশে গণতন্ত্র তত সমুন্নত হবে। তিনি বলেন, এবার বাজেটের ক্ষেত্রে করোনার কারণে শলা-পরামর্শ করার সুযোগ কম ছিল, যার ফলে বাজেটে কিছু সীমাবদ্ধতা চোখে পড়েছে। এছাড়া এই ধরনের মুক্ত আলোচনা হ্রাস পাওয়ার পেছনে কারণ হিসেবে তিনি গোষ্ঠী নির্ভরতাকেও দায়ী করেছেন। বেসরকারি খাতগুলোকে দলীয়করণ না করে গঠনমূলক সমালোচনাকে গ্রহণ করার তাগিদ দিয়েছেন তিনি।

পারভেজ করিম আব্বাসী বলেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রাপ্ত রেমিট্যান্সের সাহায্যেই বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা সচল রয়েছে। তবে এক্ষেত্রে শ্রমিকদের সীমাবদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, কোনো কারণে যদি তারা বাংলাদেশে ফিরে আসে তবে এই শ্রমিকদের আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কোনো সামর্থ্য সরকারের আছে কি না তা প্রশ্নবিদ্ধ।

ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরী শিক্ষাখাতে বরাদ্দকৃত বাজেটকে হতাশাজনক বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বাজেট প্রণয়নের অর্থবছরকে পরিবর্তন করতে হবে। বেশির ভাগ দেশে অর্থবছর থাকে জানুয়ারি-ডিসেম্বর। সেখানে বাংলাদেশ এখনো সনাতন পদ্ধতি অনুসরণ করে জুন-জুলাই অর্থবছর ধরে বাজেট প্রণয়ন করা হয়। যা অন্যান্য দেশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি এই সরকারকে এই সনাতনী পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান।

News Courtesy:

https://www.dailynayadiganta.com/first-page/590779/%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%9C%E0%A7%87%E0%A6%9F%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%95%E0%A6%BF%E0%A6%9B%E0%A7%81-%E0%A6%8F%E0%A6%B0%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A6%BE%E0%A7%9F-%E0%A6%AA%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%B6-%E0%A6%95%E0%A6%B0%E0%A6%BE-%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A7%9F%E0%A7%8B%E0%A6%9C%E0%A6%A8