পুলিশ, সাংবাদিক ও বিত্তবানরাও মাদক কারবারে জড়িত বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তিনি বলেন, যারা এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত হন, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হয়। সোমবার (২৬ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত ‘মাদকাসক্তি নিরাময়ে বেসরকারি খাতের ভূমিকা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে অন্য বক্তারা শিশু ও নারী মাদকাসক্তের সংখ্যা বৃদ্ধির কথা জানান। ধূমপান নিয়ন্ত্রণে আনলে মাদকাসক্তের সংখ্যা ৯০ শতাংশ কমে যাবে বলে মত ব্যক্ত করেন তারা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জেলখানায় গিয়ে দেখুন- মাদকের মামলায় পুলিশের সদস্য যেমন আছে, তেমনি র্যাবের সদস্য ও অন্য ব্যবসায়ীরাও রয়েছে। পুলিশ বলে তার জন্য আইন আলাদা হবে, বিষয়টি এমন নয়। পুলিশে নিয়মিত ডোপ টেস্ট করা হচ্ছে। পজিটিভ হলে তাকে বরখাস্ত করা হচ্ছে। এ জায়গাটায় আমরা খুব কঠিন অবস্থানে চলে আসছি। এছাড়া চাকরির শুরুতে যারা সিলেক্টেড হবে, তাদেরকে ডোপ টেস্ট করার প্রচলন পুরোপুরি নিতে যাচ্ছি। পুলিশ-বিজিবি সব জায়গায় ডোপ টেস্টের প্রচলন রয়েছে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মাদকাসক্ত হচ্ছে কি না জানতে ডোপ টেস্ট করব।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘নেশা করে মাদক নেয় চিকিৎসক, সাংবাদিক, ইঞ্জিনিয়ার; আমরাও নিয়ে থাকি। চিকিৎসকরা মাদক নেবে নাÑ এমনতো কথা নেই। তারা তো আলাদা জাতি না। দু-একজন পথভ্রষ্ট হতে পারে। মাদকের চাহিদা কমাতে হলে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। মাদকের কুফল সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। ২০৪১ সালের মধ্যে যে স্বপ্ন দেখছি, এই যে আমাদের উন্নয়নÑ তার সব বরবাদ হয়ে যাবে মাদকের ভয়াবহতা থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে না পারলে।
আসাদুজ্জামান খান বলেন, আমাদের সন্তানেরা অত্যন্ত মেধাবী। সেই প্রজন্মকে যদি মাদকাসক্তি থেকে রক্ষা করতে না পারি, তাহলে আমাদের স্বপ্ন অবাস্তবই থেকে যাবে। মাদকের চাহিদা কমাতে হলে মিডিয়ার অনেকখানি গুরুত্ব রয়েছে। আমরা মাদকের চাহিদা হ্রাসে শুধু ক্রোড়পত্র দিই না, ছোট ছোট টিভিসি বানাচ্ছি। প্রত্যেকটি জেলায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের জনবল ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করছি, ল্যাবও হয়েছে। সবক্ষেত্রেই অসাধু লোক রয়েছে। হেরোইন উদ্ধারের পর নাকি পরীক্ষায় পাউডার হয়ে যায়। কারণ শুধু পোর্টে কিংবা পুলিশে নয়, সব জায়গাতেই খারাপ-অসাধু মানুষ আছে। সীমান্তেও যেমন চোখ বন্ধ করে অনেকে আছে, তেমনই পুলিশেও অসাধু কেউ মাদক উদ্ধারের পর পাউডার দিচ্ছে ল্যাবে, এটাও সত্য।
দেশের জেলখানার ৬০ শতাংশ বন্দিই মাদক কারবারি জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শক্তিশালী মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন করেছি। সারা বাংলাদেশে জেলখানার ধারণক্ষমতা আছে ৪১ হাজারের বেশি। কিছুদিনের মধ্যে এটা আরও বাড়বে। কিন্তু সবসময় থাকে ৮০ হাজার থেকে লাখের বেশি বন্দি, আর এর মধ্যে ৬০ শতাংশই মাদক ব্যবসায়ী। বিচারের সময় সাক্ষী পাওয়া যায় না, আর আমাদের লম্বা জট লেগেছে মামলার। সেখানে এই মাদক মামলা হারিয়ে যায়। বিশেষ ট্রাইব্যুনাল চেয়েছি মাদক মামলার জন্য, যদিও আমরা সেটা এখনও পাইনি। যদি শাস্তিটা দৃশ্যমান হত, তাহলে ডিমান্ড হ্রাস ও সাপ্লাই কমে যেত।
মন্ত্রী বলেন, মাদকের সরবরাহ কমাতে বিজিবি, কোস্ট গার্ডের সক্ষমতা ও জনবল বৃদ্ধি করা হচ্ছে। বর্ডারে এখন অনেক কিছু করতেছি। টেকনাফে দেখেন নাফ নদীর যে বর্ডার তা দুর্গম, সেখানে বিওপি থেকে বিওপি যেতে সময় লাগে। সেন্সর লাগনো হচ্ছে সমস্ত বর্ডারে; হেলিকপ্টার টহলের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে মাদকের সাপ্লাই বন্ধ করা সম্ভব হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা ৬০ থেকে ৭০ লাখ হতে পারে। যথাযথ চিকিৎসা যেমন নেই, তেমনি ভালো হাসপাতালও নেই। মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রগুলোতে অভিজ্ঞ ডাক্তার নাই, সাইকিয়াট্রিস্ট নাই। বেসরকারি খাতে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র চালুর জন্য সরকারিভাবে সহায়তা করার আশ্বাস দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে অধ্যাপক আজিজুল ইসলাম বলেন, মানবিক বিষয় মাথায় রেখে চিকিৎসা দিতে হবে। অনেক নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে গেলে চুল ছোট করে দেওয়া হয়। এতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অধ্যাপক অরূপ রতন চৌধুরী বলেন, আমার হিসাবে দেশে ১ কোটি মানুষ মাদকাসক্ত। শিশু ও নারীদের মধ্যে মাদকাসক্তের সংখ্যা বাড়ছে। ৯৮ শতাংশ মাদকসেবীই ধূমপায়ী। এ কারণে ধূমপান নিয়ন্ত্রণে আনলে মাদকাসক্তের সংখ্যা ৯০ শতাংশ কমে যাবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান খন্দকার ফারজানা রহমান বাধ্যতামূলকভাবে স্কুলে মনোবিদ শিক্ষক নিয়োগের কথা বলেন।
News Courtesy: