ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নাগরিকের স্বাধীনতার পাশাপাশি চিন্তাকেও খর্ব করেছে বলে এক আলোচনায় উঠে এসেছে। গতকাল সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত এক ওয়েবিনারে বক্তারা বলেন, ‘এ আইনের কারণে অনেক নিরপরাধ মানুষকে কারাগারে যেতে হয়েছে, কারাগারে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। এ আইনে যেসব মামলা হয় তার বিচার হয় না। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অভিযুক্তরা ঝুলে থাকেন। সমাজে মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে ভয়ের আবহ প্রতিষ্ঠা করতে সফল হয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন।’
‘কী ঘটছে: বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮-এর ব্যবহারপ্রবণতা ও নিদর্শন’ শীর্ষক ওয়েবিনারে বলা হয়, প্রতি মাসে সরকারসংশ্লিষ্টরা এ আইনে গড়ে চারটি করে মামলা করছেন। উল্লেখ্য, সিজিএস দীর্ঘদিন ধরেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে মামলা, অভিযুক্ত, আটক, আটক ব্যক্তিদের পরিচয় ও মামলাকারীদের পরিচয়-সংক্রান্ত পরিসংখ্যানসহ বিভিন্ন তথ্য পর্যবেক্ষণ করছে। এরই অংশ হিসেবে গতকাল ওয়েবিনারে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সর্বশেষ চিত্র তুলে ধরা হয়।
ওয়েবিনারে আলোচক ছিলেন ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ডিস্টিংগুইশড অধ্যাপক ও সিজিএসের উপদেষ্টা আলী রীয়াজ, গ্লোবাল টিভির প্রধান সম্পাদক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ল’র জ্যেষ্ঠ প্রভাষক সাইমুম তালুকদার, সিনিয়র সাংবাদিক মাসুদ কামাল, বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এলিনা খান। সঞ্চালনা করেন সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমান, সভাপতির বক্তব্য দেন সিজিএসের চেয়ারম্যান মনজুর আহমেদ চৌধুরী।
অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘ভীতির পরিবেশ তৈরি করাই ছিল ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের উদ্দেশ্য। এর মাধ্যমে এমন ব্যবস্থা করা হয়েছে, যেন সবাই সার্বক্ষণিক আতঙ্কে থাকেন, প্রতিবাদ না করেন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন একটি গোষ্ঠীকে প্রটেক্ট করার জন্য করা হয়েছে। নানা সময়ে সরকারের মন্ত্রীরা এ আইন সংশোধনের কথা বললেও তা করা হচ্ছে না। তবে এ আইন সংশোধন নয় বরং বাতিল করতে হবে।’
ওয়েবিনারে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে বলা হয়, এ আইনে ৬০ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার কথা। প্রয়োজনে ১৫ দিন সময় বাড়ানো যেতে পারে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ৭৫ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়ে না। অভিযুক্তরা বিচারের আগেই দীর্ঘদিন আটক থাকেন। গত চার বছরে অন্তত ২৬ জন কিশোর এ আইনে অভিযুক্ত ও আটক হয়েছে।
গবেষকরা বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য সন্নিবেশ করেছেন। তাদের কাছে চার বছরে এ আইনের অধীন ১ হাজার ১০৯টি মামলার তথ্য রয়েছে। এসব মামলায় অভিযুক্ত ২ হাজার ৮৮৯ জন। এর মধ্যে আটক হয়েছেন ১ হাজার ১১৯ জন, অর্থাৎ মোট অভিযুক্ত মানুষের ৩৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ আটক হয়েছেন। যদিও এটি সম্পূর্ণ চিত্র নয় বলেই মনে করছে সিজিএস। কারণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মামলার তথ্য প্রকাশ করতে চায় না।
আলী রীয়াজ আরো বলেন, ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে হওয়া মামলায় ১ হাজার ২৯ জন অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিচয় জানা গেছে। এর মধ্যে ৩০১ জন রাজনীতিবিদ, যারা মোট অভিযুক্তের ৩০ শতাংশ এবং এর মধ্যে ৯২ জন কোনো না কোনো সময় আটক হয়েছেন। সাংবাদিক রয়েছেন ২৮০ জন, যারা মোট অভিযুক্তের ২৭ শতাংশ। শিক্ষার্থী ১০৬ জন, তারা মোট অভিযুক্তের ১০ শতাংশ এবং এদের ৭১ শতাংশই আটক হয়েছে। এছাড়া শিক্ষক অভিযুক্ত হয়েছেন ৫১ জন। তবে অভিযুক্ত অন্যদের চেয়ে শিক্ষার্থীদের আটকের হার বেশি।’
ওয়েবিনারে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীকে কটূক্তির অভিযোগে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়েছে ১৪০টি। এসব মামলায় অভিযুক্ত ২১০ জন, এর মধ্যে আটক হয়েছেন ১১৫ জন। রাজনীতিবিদদের মানহানির অভিযোগে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে হওয়া মামলার অধিকাংশ বাদী তাদের সমর্থকরা। এ মামলার ৬৩৬ জন অভিযোগকারীর পেশা শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ১৯২ জন বা ৩০ শতাংশই আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও সরকারি কর্মচারী। এছাড়া ১৯৮ জন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং তার সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মী।
গ্লোবাল টিভির প্রধান সম্পাদক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা বলেন, ‘এ আইনের আওতায় আমরা আসলে কতটা নিরাপদ হয়েছি তা প্রশ্নসাপেক্ষ, এ আইন যতটা প্রগতিশীল মহলের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে, ততটা মৌলবাদীদের এ আইনের আওতায় আনা যায়নি। এ আইন বড় অংশই ব্যবহার হয়েছে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের কথা বলে। অথচ ওয়াজ-মাহফিলে প্রতিদিন বাংলাদেশের মূল চেতনার বিরুদ্ধে কথা বলা হচ্ছে।’
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক সাইমুম রেজা তালুকদার বলেন, ‘ডিজিটাল নিরাপত্তার সংজ্ঞা নেই বলে এ আইন নাগরিকের অধিকারকে সুরক্ষা দেয়ার আইন হতে পারে না। এ আইনে রাষ্ট্র নিপীড়কের ভূমিকা নিয়েছে কিনা তা বিশ্লেষণ করা দরকার।’
News Courtesy: