রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগের যে সংস্কৃতি রয়েছে তা দেশের ‘সর্বনাশের কারণ’ বলে মন্তব্য করেছেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। তিনি বলেছেন, ‘উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগ হচ্ছে বাংলাদেশের সর্বনাশের অন্যতম কারণ। আমরা সারাক্ষণ শুধু নি¤œ আদালতের স্বাধীনতার কথা বলে চিৎকার করি। নি¤œ আদালতের স্বাধীনতা বলতে আমরা বুঝি উচ্চ আদালতের কাছে তার জবাবদিহিতা থাকবে, এটাই তো?’
গতকাল সোমবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ আয়োজিত এক সংলাপে বক্তব্য রাখছিলেন আইনের শিক্ষক আসিফ।
দলবাজ বিচারক যে সুশাসনের অন্তরায় তা তুলে ধরতে গিয়ে আইন উপদেষ্টা বলেন, ‘প্রথমে আপনাকে ফিক্সড করতে হবে উচ্চ আদালত, উচ্চ আদালতে নিয়োগটা ঠিক করতে হবে। নিয়োগের সঙ্গে যদি জয় বাংলা বা জিন্দাবাদ করা লোক আসবেÑএটা যদি নিশ্চিত হয়ে যায়, তখন তো আর উচ্চ আদালতের কাছে আপনি কিছু আশা করতে পারবেন না।’ তিনি বলেন, ‘বিচার বিভাগের সংস্কারে দাবি যেটা, এটা নতুন না; এটা বহু বছর ধরে কথা হচ্ছে। ২০-২৫ বছর ধরে বলা হচ্ছে, উচ্চ আদালতে বিচারকের নিয়োগের জন্য আইন করতে হবে। নি¤œ আদালতে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। নি¤œ আদালতের জন্য একটা সেক্রেটারিয়েট গঠন করতে হবে। প্রসিকিউশন সার্ভিস চালু করতে হবে, যাতে মামলা বিলম্বিত না হয়, এগুলোÑঅ্যাড্রেস করতে হবে। এগুলো আমরা জানি। আমাদের বিচার বিভাগ সংস্কার একটা কমিশন হয়েছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা থেকে উপদেষ্টার দায়িত্বে আসা আসিফ নজরুল বলেন, ‘আমি যখন এখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছি, তখন আমি ভাবছি এখানে আমি আসলাম কেন? আমি তখন ভাবলাম, এটা শেষ হবে কবে। আমার তো আসার দরকার নাই। আমার খুব হতাশ লাগত, কবে শেষ হবে, কবে রিপোর্ট দেবে, পলিটিক্যাল পার্টির সঙ্গে বসতে হবে। ডায়ালগ হবে, পরে কি এত সময় থাকবে?’
তিনি বলেন, “আমি আমাদের সংস্কার কমিশনের সঙ্গে কথা বলেছি, প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে কথা বলেছি। উনি বলেছেন, ‘যেসব বিষয়ে ইতোমধ্যে জাতীয় ঐক্য আছে, তা করে ফেল’। তারপরও সংস্কার কমিশন বিচার বিভাগীয় সংস্কার কমিশনের অনুমতি নিয়ে আমরা কিছু সংস্কার করছি।”
তিনি আরও বলেন, ‘উচ্চ আদালতে তিনটা বিচার বিভাগীয় সংস্কার কমিটি করে দিয়েছেন, যেখানে প্রধান বিচারপতি উনার অফিসের মাধ্যমে, আবার ১/১১ একটা ড্রাফট করে দিয়েছিল এবং আমরা নিজেরা আইন মন্ত্রণালয়ের বড় কনসালট্যান্সির মাধ্যমে একটা আইন করছি।’
এছাড়া তিনি বলেন, ‘এই শনিবার ইচ্ছা আছে যে বিভিন্ন আইনবিদ, রাজনৈতিক দলের মধ্যে আইনবিদ আছেনÑআমরা একটা ব্রড বেইজ কনসালট্যান্সি করব। আমরা এটা করে যদি ৩০-৪০ জন ভালো বিচারপতি নিয়োগ দিয়ে যাই উচ্চ আদালতে, অন্তত মানুষ তো ২০-২৫ বছর ভালো বিচারপতি পাবে।’
আইন উপদেষ্টা বলেন, ‘উচ্চ আদালতে ভালো একটা সেক্রেটারিয়েট দরকার। মানুষজন বলে, সচিবালয় নাম করা দরকার; নাকি আমাদের প্রধান বিচারপতির অফিস থেকে একটা প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। আরেকটা হচ্ছে স্থায়ী প্রসিকিউশন সার্ভিস।’
বছরখানেক সময় পেলে সংস্কার কাজগুলো সম্পন্ন করতে পারবেন জানিয়ে আসিফ নজরুল বলেন, ‘ইচ্ছা আছে, যদি বছরখানেক সময় পেলে এই কাজগুলো করে যাব। তারপরও পলিটিক্যাল পার্টির ওনারশিপের একটা ব্যাপার আছে, পরের সরকার এসে এগুলো বাতিল করে দিতে পারে। আমার মনে হয় আমাদের ঐকমত্য যত শক্ত থাকবে, পরবর্তী সরকার সেটা বাতিল করতে তত কঠিন হবে, অসম্ভব হবে।’
উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, ‘আমি সবসময় বলতাম দেশে যদি সুষ্ঠু নির্বাচন হয়, তাহলে বিচার বিভাগ কখনও এত নির্মম, এত নিপীড়কে পরিণত হতে পারে না। আমার একটা থিউরি আছে, দেশে পাঁচ বছর পরপর নির্বাচন হলে এবং জনগণের রায় প্রকৃতভাবে প্রতিফলিত হলে বাংলাদেশে অত্যাচারী শাসক দলগুলো যারা আছে, তারা এতটা অত্যাচারী হতে পারে না।’
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘এখানে আলোচনার ইস্যু হচ্ছে রিফর্ম অব পলিটিক্যাল পার্টি; কেউ কেউ বলেছে, রিফর্ম অব জুডিসিয়ারি সিস্টেম করতে গিয়ে রিফর্ম অব পলিটিক্যাল পার্টি এসেছে। আসল কথাটা কেউ বলেন নাই। ফান্ডামেন্টাল রিফর্ম লাগবে, ইকোনমিকাল সিস্টেম লাগবে। লুটপাটতন্ত্র যতদিন থাকবে, আমাদের আইনি কাঠামো বা আইনি ব্যবস্থার পরিবর্তন আনতে পারব না। একটা শ্রেণি বিভক্ত সমাজে প্রকৃত বিচার সম্ভব না।’ তিনি বলেন, ‘সুতরাং কথা হলো যাহা আইনসঙ্গত, তাহাই যে ন্যায়সঙ্গত হবেÑ এটা মনে করার কোনো কারণ নাই। আমাদের বিচারব্যবস্থাকে যাহা ন্যায়সঙ্গত, তাহার সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে হবে।’ সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) চেয়ারম্যান মুনিরা খান অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন।
News Courtesy:
‘দলবাজ’ বিচারক হলে কিছুই আশা করতে পারবেন না: আসিফ নজরুল – শেয়ার বিজ