সেন্টার ফর গবর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত “অনন্ত দুর্দশা: ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট-এ অভিযুক্তদের অবস্থা” শীর্ষক ওয়েবিনার গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১১ টায় অনুষ্ঠিত হয়। ওয়েবিনারে মুখ্য আলোচক ছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিসটিংগুইশড প্রফেসর ড. আলী রীয়াজ। ওয়েবিনারে উপস্থিত আলোচকদের মধ্যে ছিলেন, মানবাধিকার কর্মী, সাংবাদিক ও ভুক্তভোগী মোঃ আব্দুল কাইয়ুম; রংপুর জেলা জজ কোর্টের এডভোকেট মোঃ রায়হান কবীর; রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন-এর অর্থনৈতিক সমন্বয়কারী ও ডিএসএ ভিকটিম নেটওয়ার্ক এর সদস্য দিদারুল ইসলাম ভূঁইয়া, আর্টিকেল নাইনটিন বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার, রুমকী ফারহানা এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক, ফারুখ ফয়সল। ওয়েবিনারে সভাপতিত্ব করেন, সেন্টার ফর গবর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)-এর চেয়ারম্যান ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরী। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সেন্টার ফর গবর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)-এর নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমান।
জিল্লুর রহমান ওয়েবিনারের শুরুতে বলেন, বাংলাদেশের সকল মানুষের অধিকার হরণ করার প্রবণতা দেখা দিয়েছে। আইসিটি অ্যাক্ট বাতিল হয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন হয়েছিল, সেটিও পরিবর্তিত হয়ে সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট প্রণয়ন করা হয়েছে, কিন্তু সেই ভয়ের আবহ এখনো আছে। জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, এই আইনের যেভাবে প্রয়োগ হয়েছে তারপরও কেন এই আইন বাতিল করা হবে না? এই আইনের অধীনে অভিযুক্তরা কেন মুক্তি পাবেন না? মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার্থে আমাদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন।
ওয়েবিনারে ডিএসএ বিষয়ক চতুর্থ গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন প্রফেসর ড. আলী রীয়াজ। তিনি ঘটনাক্রমের সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরে বলেন, আইনমন্ত্রীর দেয়া বিবৃতিতে তথ্যের অনুপস্থিতি রয়েছে। আইনমন্ত্রীর দেয়া তথ্যানুসারে ৭০০১টি মামলা হয়েছে বলা হলেও, এই আইনের অধীনে সর্বমোট গ্রেপ্তার সংখ্যা, কারাগারে আটক ব্যক্তির সংখ্যা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় সম্পর্কিত কোনো তথ্য জানানো হয়নি।
তিনি আরও বলেন, সিজিএস’র গবেষণায় প্রাপ্ত তালিকা অনুযায়ী, অক্টোবর ২০১৮ থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৩ পর্যন্ত মামলা দায়ের হয়েছে ১৪১০ টি, মোট অভিযুক্ত ৪৪০৪ জন, যেক্ষেত্রে গ্রেপ্তার হয়েছেন ১৫১৯ জন। ১৪৮৬ জন অভিযুক্তের পেশা শনাক্ত করা হয়েছে, তার মধ্যে রাজনীতিবিদ ৩১ শতাংশ, শিক্ষার্থী ৯ শতাংশ, শিক্ষক ৩ শতাংশ এবং সাংবাদিক ২৯ শতাংশ। পেশা অনুযায়ী মোট গ্রেপ্তার হয়েছে ৫৬৩ জন। প্রধানমন্ত্রীর মানহানির জন্য মামলা হয়েছে ১৯০ টি, গ্রেপ্তার হয়েছেন ১৬১ জন এবং অভিযুক্ত হয়েছেন ৪৬৪ জন। মন্ত্রীদের মানহানির জন্য মামলা হয়েছে ৮০ টি, গ্রেপ্তার হয়েছেন ৬৮ জন এবং মোট অভিযুক্ত হয়েছেন ৩৩৭ জন। রাজনীতিবিদদের মানহানির দায়ে মামলা হয়েছে ২০৮ টি, অভিযুক্ত হয়েছেন ৭২৪ জন এবং গ্রেপ্তার হয়েছেন ১৩৫ জন।
দশজন ভুক্তভোগীর বিরুদ্ধে দায়েরকৃত ১২টি মামলার পর্যালোচনার সামগ্রিক চিত্র বিশ্লেষণপূর্বক দেখা যায় যে, বিচারের আগেই দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে আটক রাখা, চার্জশিট দাখিলে দীর্ঘসূত্রিতা, ব্যক্তিগত স্বার্থে ভিন্ন মতাবলম্বীদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা দেখা যায়। তিনি এক্ষেত্রে সরকারের করণীয় নিয়ে বলেন, সরকারের উচিৎ এই আইনের অধীনে করা মামলাগুলোর কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা, মামলাগুলোর তথ্য জনসাধারণের কাছে উন্মুক্ত করা, এবং একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করা। শুধু নাম বা খোলস বদলে দিলেই অন্তহীন দুর্দশার শেষ হচ্ছে না। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি আরও বলেন, প্রত্যেক এলাকায় ক্ষমতাশীল ব্যক্তিদের মধ্যে এই আইন ব্যবহার করার প্রবণতা দেখা গেছে।
আব্দুল কাইয়ুম বলেন, বাংলাদেশের মানুষকে চাপে রাখার জন্য এই ধরণের আইনই যথেষ্ট। বিরোধী মতকে দমন করার জন্য এই আইনকে ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি তার অভিজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, আমাকে ফাঁসানোর জন্য সংসদ সদস্যের জামাতা দিয়ে মামলা করা হয়েছে। ফরেনসিক রিপোর্টে অনুযায়ী আমার সম্পৃক্ততা প্রমাণিত না হলেও চার্জশিটে আমাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
এডভোকেট রায়হান কবীর বলেন, ডিএসএ তৈরি করাই হয়েছে মন্ত্রীদের নিরাপত্তা দেয়ার জন্য। অবাক করা বিষয় হচ্ছে, এই আইন বাতিল করা হলেও এর অধীনে অভিযুক্ত ও গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মুক্তি মিলছে না।
দিদারুল ইসলাম ভূঁইয়া নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, আদালতে পঞ্চম বারে জামিন পাই। মুশতাক ছয় বার আবেদন করেও জামিন পায়নি। আমি জানি না ওর উপর নির্যাতন করা হয়েছিল কি না, আমাদের কিছুদিন পর আলাদা রাখা হয়েছিল। গণভোট করে এই ধরনের নিপীড়নমূলক, নিবর্তনমূলক সকল আইন বাতিল করা হোক।
রুমকী ফারহানা সকল আলোচকদের সাথে একমত পোষণ করে বলেন, আর্টিকেল নাইনটিন মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে সব সময় কাজ করে আসছে। অপ্রাপ্ত বয়স্কদের বিরুদ্ধে মামলার বিষয়টি নিয়ে বারংবার কথা বলার পরেও কিন্তু তা দমন করা যায়নি। সেন্টার ফর গবর্ন্যান্স স্টাডিজের রিপোর্টের সাথে সংহতি প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, আর্থিক, রাজনৈতিক ক্ষমতাধরদের এই আইন ব্যবহার করা নিয়ে বিচার হোক, মামলাগুলোর নিষ্পত্তি হোক, নিরপরাধ মানুষদের মুক্তি দেয়া হোক।
ফারুখ ফয়সল তার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন হওয়ার পর লন্ডন অফিসে আইনটির একটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এই আইনটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আইন এবং চুক্তি বিরোধী। তিনি আরও বলেন, জনগণের প্রয়োজনে আইন হওয়া প্রয়োজন, অন্য কারও জন্য নয়। এক সাথে সকল সংগঠনের উচিৎ দেশের জন্য কাজ করা।
ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, এরপর সাইবার নিরাপত্তা আইন, এমন আইন ব্যবহার করে ভয়ের সংক্রমণ ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কবিতা লেখার জন্য জেলে যাওয়ার ঘটনা কাজী নজরুল ইসলামের কারাবরণের ঘটনা মনে করিয়ে দেয়। সাইবার ক্রাইমের বিরুদ্ধে আইন দরকার, কিন্তু কর্তৃপক্ষ সেক্ষেত্রে নির্বিকার। অথচ, লুটপাট, দুর্নীতি নিয়ে কথা বললেই জেলে ভরে দেয়ার প্রবণতা দেখা দিয়েছে।
News Courtesy: