গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ-সিজিএস আয়োজিত অন্তহীন দুঃস্বপ্ন-বাংলাদেশের ডিজিটাল সিকিউরিটি এ্যাক্ট ২০১৮ শীর্ষক ওয়েবিনারে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের উপর একটি গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ডিস্টিংগুইসড প্রফেসর এবং সিজিএস’র উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য ড. আলী রীয়াজ বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ ক্ষমতাসীনদের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে ২৬ মাসে মোট অভিযুক্ত হয়েছেন দুই হাজার ২৪৪ জন ও আটক হয়েছেন ৮৪২ জন এবং মোট মামলার সংখ্যা ৮৯০টি। তিনি বলেন, দেশে বিগত ৯ মাসে এই আইনের অধীনে মামলা এবং আটকের সংখ্যা উল্লেখজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, ২০২৩ সালের আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে এর সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। তিনি বলেন, যেহেতু আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে হয়েছে সেহেতু মন্ত্রী চাইলেই তাঁর দায় এড়াতে পারেন না।
গতকাল শনিবার সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত অন্তহীন দুঃস্বপ্ন- বাংলাদেশের ডিজিটাল সিকিউরিটি এ্যাক্ট ২০১৮ শীর্ষক একটি ওয়েবিনারে তিনি এইসব কথা বলেন। ওয়েবিনারে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের উপর একটি গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন গবেষণা কার্যক্রমের মুখ্য গবেষক সিজিএস’র উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য ড. আলী রীয়াজ। ওয়েবিনারে আলোচনায় অংশ নিয়ে বক্তব্য রাখেন, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রি. জে. ড. এম সাখাওয়াত হোসেন (অব.), সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন’র সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর, আর্টিকেল নাইনটিনের বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক ফারুখ ফয়সল। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সিজিএস-র চেয়ারম্যান ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরী এবং সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন সিজিএস-এর নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমান।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে সাংবাদিকদের অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, এই আইনের আওতায় সবচেয়ে বেশি অভিযুক্ত এবং আটক হয়েছেন স্থানীয় সাংবাদিকরা। তিনি বলেন, শিক্ষকরা এই আইনে অভিযুক্ত হওয়ার সাথে সাথে আটক হন। এমনকি সরকারি কর্মচারীরাও রয়েছেন ভুক্তভোগীর তালিকায়। এই আইনের অধীনে অভিযোগকারী কারা সেটি গবেষণার মাধ্যমে উঠে এসেছে। সবচেয়ে বেশি অভিযোগ করেন রাজনীতিবিদরা (৪০.৫৫%)। সরকারের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও মামলা করে থাকেন, যেমন- আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী, সরকারি কর্মকর্তা। সরকারের সমর্থন আছে এই রকম মামলার পরিমাণ ৩০.৩১%।
ড. আলী রীয়াজ উল্লেখ করেন, এই আইন ক্ষমতাসীনদের হাতিয়ার। অভিযোগকারীর মধ্যে যাদের রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা আছে বলে চিহ্নিত করা গেছে তার মধ্যে ১৬৭ জন, অর্থাৎ ৮১ শতাংশ আওয়ামী লীগ এবং তার অঙ্গ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। অভিযোগকারী নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সংখ্যা বেশি। এজন্য স্থানীয় সাংবাদিকরা এই আইনের জন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করে ড. আলী রীয়াজ বলেন, এই প্রতিবেদনটি ১ জানুয়ারি ২০২০ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২ পর্যন্ত সরকার অনুমোদিত প্রিন্ট এবং ইলেক্ট্রনিক গণমাধ্যম, অভিযুক্ত বা অভিযুক্তের পরিবার এবং তাদের নিকটজন, অভিযুক্তের আইনজীবী, এবং থানা ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে করা। তিনি বলেন, এই গবেষণা প্রকল্পটি ন্যাশনাল এনডাউমেন্ট ফর ডেমোক্রেসি- এর অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, জানুয়ারি ২০২০ ফেব্রুয়ারি ২০২২- এই সময়ের মধ্যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন- এর অধীনে মোট অভিযুক্ত হয়েছেন ২ হাজার ২৪৪ জন, মোট আটক হয়েছেন ৮৪২ জন এবং মোট মামলার সংখ্যা ৮৯০টি। ২৬ মাসের গড় হচ্ছে প্রতিমাসে ৮৬ জনের বেশি অভিযুক্ত হন, গড়ে ৩২ জন আটক হন এবং গড়ে মামলা হয় ৩৪টির বেশি। ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত অভিযুক্ত হয়েছেন ৯১৩ জন, আটক হয়েছেন ২৭৩ জন এবং মামলার সংখ্যা ৪২৬টি। মাসে গড়ে অভিযুক্ত হচ্ছিলেন ৬০.৮৬ জন, আটক হচ্ছিলেন ১৮ জন। ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অভিযুক্তের সংখ্যা ১৩৩১ জন, আটক হয়েছেন ৬০৯ জন এবং মামলার সংখ্যা ৪৬৪টি। মাসে গড়ে অভিযুক্ত হচ্ছেন ১৪৭ জন করে, আটক হচ্ছেন ৬৭ জন করে এবং মামলা হয় ৫১টির বেশি। অভিযুক্তদের পেশা সম্পর্কে তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, মোট পেশা পাওয়া গিয়েছে ৮২০ জনের। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পেশার মানুষ হচ্ছেন রাজনীতিবিদ (২৫৪ জন) এবং পরবর্তীতে আছেন সাংবাদিক (২০৭ জন)। অভিযুক্তদের বয়স বিবেচনায় উঠে আসে তরুণরাই এই মামলার দ্বারা সবচেয়ে বেশি হেনস্তার শিকার হন। ১৮ বছরের নিচে যাদের বয়স তাদেরকেও অভিযুক্ত করা হয়। আটককৃতদের মধ্যে যাদের পেশা পাওয়া গিয়েছে সবচেয়ে বেশি আটক হয়েছেন রাজনীতিবিদরা (২৫.৪০%) এবং পরবর্তীতে আছেন সাংবাদিকরা (১৮.৭৩%)। আটককৃতদের মধ্যে ছাত্রদের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হারে বেশি বলে তিনি গবেষণায় উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, সবচেয়ে বেশি মামলা করা হয়েছে ২৫ এবং ২৯ ধারায় এবং সবচেয়ে বেশি অভিযুক্ত রয়েছে ৩৫ ধারায়। এই ধারাগুলোর অপব্যবহার রাজনীতিবিদ এবং সাংবাদিকদের স্বাধীন মত প্রকাশের ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করেছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রধানমন্ত্রীর অবমাননার অভিযোগে মামলা করা হয়েছে ৯৮টি, মন্ত্রীর অবমাননার মামলা করা হয়েছে ৫১টি এবং রাজনৈতিক নেতাদের আবমাননার মামলা করা হয়েছে ৭৫টি। ফেসবুকে মতামত প্রকাশের জন্য এই আইনের অধীনে মামলা করা হয়েছে ৩৯৯টি। তিনি উল্লেখ করেন, সরকারের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে স্বচ্ছতা নেই, গণমাধ্যমে সব মামলার খবর প্রকাশিত হয়না। এমনকি পুলিশও সহায়তা করে না। তথ্য অধিকার আইনের সাহায্য নিয়েও এই বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায় না। তিনি বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন- এর যথেচ্ছ ব্যবহার জনগণের জন্য এক অন্তহীন দুঃস্বপ্ন তৈরি করেছে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে
সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রি. জে. ড. এম সাখাওয়াত হোসেন (অব.) বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন- এর মাধ্যমে আইন শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীকে অবাধ স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, সরকারের মধ্যে ক্ষমতা হারানোর যে শঙ্কা কাজ করে সেই শঙ্কা থেকেই সরকার নিজেদের সুরক্ষার জন্য এই আইন প্রণয়ন করেছে। তিনি বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন- এর প্রয়োজন আছে। কিন্তু আইন কোথায় দরকার সেটা বুঝতে হবে। এই আইনের ফলে মুক্ত ভাবের আদান-প্রদানের জায়গা সংকুচিত হয়েছে। এজন্য মুক্ত গণতন্ত্রের চর্চা এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন’র সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, রাষ্ট্রে সংবিধানের মাধ্যমে নাগরিকদের বাকস্বাধীনতা এবং মত প্রকাশের যে অধিকার দেওয়া হয়, কর্তৃত্ববাদী সরকার আইন প্রণয়ন এবং সেসকল আইনের প্রয়োগের মাধ্যমে নাগরিকদের এই অধিকার হরণ করে। তিনি বলেন, এ সকল আইন যে যার বিরুদ্ধে চায়, তার বিরুদ্ধেই ব্যবহার করতে পারে নিজের ইচ্ছামতো। ফলে শাসকগোষ্ঠী আইনকে এক প্রকার অস্ত্রে রূপান্তরিত করে ব্যবহার করে। তিনি বলেন, বর্তমানে আইন প্রণয়ন করা হয় ক্ষমতাসীনদের স্বার্থে ব্যবহারের জন্য। বিশেষত, বিচার বিভাগের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর দলীয়করণের পর থেকে জনগণ কোনো আইনের সুফল ভোগ করতে পারছে না। দেশের সুশাসনের পরিবর্তে চলছে দুঃশাসন।
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর বলেন, আমাদের এই অন্তহীন দুঃস্বপ্ন চলমান রয়েছে ২০০৯ সাল থেকে। ২০০৯ সালের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন- এর অপব্যবহারসমূহ ২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন- এর মাধ্যমে জারি রাখা হয়েছে। তিনি বিশেষভাবে রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তির অবমাননা এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা- এই দুইটি বিষয়কে উপজীব্য করে বলেন, রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তি কী- এই বিষয়টি আইনে স্পষ্ট নয়। জনগণকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তির অবমাননা আসলেই কোনো অপরাধের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে কিনা।
আর্টিকেল নাইনটিনের বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক ফারুখ ফয়সল বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনা করতে গেলে সবকিছুর জন্যই আইন প্রয়োজন। কিন্তু সেই আইন কোনো বিশেষ মতাদর্শকে অথবা সরকারি দলকে রক্ষা করার জন্য নয়- বরং আইন প্রয়োজন জনগণকে রক্ষা করার জন্য। তিনি বলেন, দেশে যে নতুন ডাটা প্রটেকশন অ্যাক্ট এবং ওটিটি অ্যাক্ট আসছে, সেগুলো ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন- এর চেয়েও ভয়াবহ। গবেষণার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, গবেষণায় উঠে এসেছে ১৮ বছরের কম বয়সীদেরকেও এই আইনের আওতায় অভিযুক্ত এবং আটক করা হয়েছে। শুধু এই ১৮ বছরের নিচের নাগরিকদেরকে নয়, এই আইনের আওতায় গৃহবধূকেও আটক করা হয়েছে এমন নজিরও রয়েছে। তিনি বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন- এর এই স্বেছাচারী ব্যবহার নাগরিকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করে দিয়েছে।
সিজিএস-এর চেয়ারম্যান ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন আমাদের সাইবার স্পেসের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, বিগত ৯ মাসের সংখ্যা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন- এর অধীনে দায়েরকৃত মামলার সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এটি বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, এই মামলাগুলোর মধ্যে ৮১ শতাংশ মামলাই সরকারদলীয় ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানের সঞ্চালক সিজিএস-এর নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমান বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন- এর সীমাবদ্ধতাগুলোকে দূর করে একটি ‘ভালো’ আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্যে। এই আইনে সাংবাদিকদের সুরক্ষা প্রদানের কথা বলা হলেও সাংবাদিকদের দমনের জন্যই এই আইন করা হয়েছে।
News Courtesy: