আজ ১লা অক্টোবর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ কার্যকরের তিন বছর পূর্ণ হয়েছে। এই আইন নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) পর্যবেক্ষণমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তারা বলছে, বিগত তিন বছরে সরকারের সমালোচকদের বিরুদ্ধে এই আইনের ব্যবহার চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। ফলে দেশে এবং দেশের বাইরে মানবাধিকার সংগঠনগুলো তীব্র নিন্দা জানিয়ে আসছে। এই কঠোর আইন ব্যাপক হারে ব্যবহারের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিকে সম্পাদক পরিষদ ‘দুঃস্বপ্নের বাস্তবতা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আইনটি বাংলাদেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে। সাংবাদিক এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের নাগরিকগণ ডিজিটাল মাধ্যমে মতামত প্রকাশের জন্য এই আইনের দ্বারা দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন।
গতকাল দেয়া এক প্রেসবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ এর তিন বছর উপলক্ষে, গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিজিএস এই আইনের ব্যবহার সম্পর্কে কিছু পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন করছে। আইনটি চালু হওয়ার পর থেকে কথিত সাইবার অপরাধ সম্পর্কিত দায়ের করা মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। বিভিন্ন গণমধাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১৩ সাল থেকে প্রাথমিকভাবে তথ্য ও যোগাযোগ আইন- এর অধীনে এবং পরবর্তীতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন- এর অধীনে সাইবার ট্রাইব্যুনালে করা মোট মামলার সংখ্যা ৪,৬৫৭ টি। এর মধ্যে ৯২৫ টি মামলা দায়ের করা হয়েছে ২০১৮ সালে, ১১৮৯ টি মামলা দায়ের করা হয়েছে ২০১৯ সালে এবং ২০২০ সালে দায়েরকৃত মামলার সংখ্যা ১১২৮ টি। বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, ১লা জানুয়ারি ২০২০ থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১- এই সময়ের মধ্যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮- এর অধীনে ১৫০০ টিরও বেশি মামলা দায়ের করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা ভিন্ন মতের বিরুদ্ধে এই কঠোর আইন ব্যবহার করেছে এবং এই ব্যবহার অব্যাহত রয়েছে।
সিজিএস বলছে, তারা ১ জানুয়ারি, ২০২০ থেকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮- এর অধীনে দায়ের করা মামলাসমূহ চিহ্নিত করে নথিভুক্ত করছে। প্রকল্পটি ন্যাশনাল এনডাউমনেট ফর ডেমোক্রেসি-এনইডির অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে। এই প্রকল্পে মুখ্য গবেষক হিসেবে আছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির সরকার ও রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর ড. আলী রীয়াজ। সিজিএস ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬৬৮ টি মামলার বিবরণ চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ৬৬৮ টি মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তির সংখ্যা ১৫১৬ জন, যার মধ্যে ১৪২ জন সাংবাদিক, ৩৫ জন শিক্ষক, ১৯৪ জন রাজনীতিবিদ, ৬৭ জন শিক্ষার্থী। আমরা ৫৭১ জন মানুষের পেশা চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছি। মোট মামলার প্রায় ৯ দশমিক ৩৭ শতাংশ এবং যাদের পেশা চিহ্নিত করা হয়েছে তাদের মধ্যে ২৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ ব্যক্তি সাংবাদিক।
যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের মধ্যে সাংবাদিকদের সংখ্যা অসমভাবে বেশি। গ্রেপ্তারকৃত ৪৯৯ জনের মধ্যে ৪২ জন সাংবাদিক, ৫৫ জন রাজনীতিবিদ, ৩২ জন শিক্ষার্থী। এখন পর্যন্ত চিহ্নিত ৬৬৮ টি মামলায় ১৮ বছরের কম বয়সী ১৩ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। ময়মনসিংহের ভালুকায় মোবাইল ফোন ব্যবহারের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপের সিদ্ধান্তের বিষয়ে মন্তব্য করার প্রেক্ষিতে ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রীকে অপমান করার অভিযোগে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ এর অধীনে করা মামলায় গ্রেপ্তারের পর নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে ২০ জুন, ২০২০ তারিখে কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে।
এই মামলাগুলোর বেশিরভাগই ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের দ্বারা না হয়ে দায়ের করা হয় অন্যদের দ্বারা। প্রায়ই ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা তাদের নেতাদের পক্ষ নিয়ে মামলাগুলো দায়ের করেন। অভিযোগকারীদের রাজনৈতিক পরিচয় চিহ্নিত করার পর দেখা যায় তাদের মধ্যে ৮৫ শতাংশ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের। এছাড়া আইন প্রয়োগকারী সংস্থা মামলা করেছে ৭৬ টি, যা কিনা মোট দায়েরকৃত মামলার ২০ দশমিক ৩২ শতাংশ।
আইনের অধীনে হওয়া মামলাসমূহ পর্যালোচনা চলাকালীন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মানহানির অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে ৭৪ টি। এর মধ্যে ১৩ টি মামলা দায়ের করেছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং ৬১ টি মামলা দায়ের করা হয়েছে ব্যক্তির দ্বারা। ৩৬ জন অভিযোগকারীর রাজনৈতিক পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে, যারা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। মানহানির অভিযোগে সবচেয়ে বেশি মামলা দায়ের করা হয়েছে ২০২১ সালের এপ্রিল মাসে, মোট ১৩ টি মামলা। এর আগে ২০২০ সালের জুন মাসে ১১ টি মামলা দায়ের করা হয়েছিল, যা কিনা মামলার সংখ্যার হিসাবে একমাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এই অভিযোগে মোট ৪৪ জন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে দুজন জামিন পেয়েছেন।
মন্ত্রীদের মানহানির অভিযোগে ৪১ টি মামলা দায়ের করা হয়েছে, যার মধ্যে মাত্র ৪ টি মামলা দায়ের করা হয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা তার পরিবারের পক্ষ থেকে, যেখানে বাকি ৩৪ টি মামলা দায়ের করেছেন দলীয় নেতাকর্মীরা। এসব মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১৭ জনকে, জামিন পেয়েছেন ৩ জন।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন- ২০১৮ এর অধীনে অভিযোগের জন্য আইনটির ধারা ২৯, ধারা ২৫, ধারা ৩৫ এবং ধারা ৩১ সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। অভিযুক্তদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক রাজনীতিবিদ; পরবর্তী অবস্থানে রয়েছেন সাংবাদিকরা।
বিচার প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে এই মামলাগুলো অত্যন্ত ধীরগতির। এখন পর্যন্ত মাত্র ২টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। লেখক এবং সমাজকর্মী মুশতাক আহমেদ ২০২১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ এর অধীনে আটক অবস্থায় কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন। ৩৫ জনকে অন্তর্র্বতীকালীন জামিন দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য যে, অভিযুক্তদের জামিন আবেদন নিম্ন আদালতে নাকচ হয়ে যায়। মুশতাক আহমেদ- এর জামিন ছয়বার নাকচ করা হয়েছিল। মুশতাক আহমেদ- এর একজন সহ-অভিযুক্ত আহমেদ কবির কিশোর- এর জামিন নিম্ন আদালতে অন্তত ছয়বার নাকচ হওয়ার পর ২০২১ সালের মার্চ মাসে তাঁকে অন্তর্র্বতীকালীন জামিন দেওয়া হয়।
এমন অভিযোগ আছে যে, সাদা কাপড় পরিহিত পুলিশ এবং র্যাব সদস্যরা তুলে নিয়ে যাওয়ার পরে অনেককে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন- এর অধীনে অভিযুক্ত করা হয়েছে। আহমেদ কবির কিশোর অভিযোগ করেন যে, র্যাবের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করার তিনদিন আগে তাঁকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, এই সময়ের মধ্যে তাঁকে মারাত্মকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। তিনি বলেছেন, মুশতাক আহমেদকেও হেফাজতে নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছিল।
আইন অনুযায়ী অতিরিক্ত ১৫ দিনের সঙ্গে ৬০ দিনের মধ্যে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। যদি এই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ না হয়, তাহলে সাইবার ট্রাইব্যুনালের অনুমোদন সাপেক্ষে আরও ৩০ দিন সময় দেওয়া হয়। কিন্তু গত তিন বছর ধরে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল না করার পরেও অভিযুক্ত এখনও হেফাজতে আছে এবং বিচারের আগেই তারা কার্যকরভাবে শাস্তি ভোগ করছেন।
উল্লেখ্য, গ্রেপ্তার হওয়ার দশ মাস পর শফিকুল ইসলাম কাজলকে অভিযুক্ত করা হয়। প্রথম মামলা দায়েরের পর ৫৩ দিন ধরে কাজল নিখোঁজ ছিলেন। পরবর্তীতে তাঁকে সীমান্তবর্তী একটি শহর থেকে উদ্ধার করা হয় এবং তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। নিম্ন আদালত তাঁর জামিন নাকচ করলে সাত মাস তাঁকে কারাগারে থাকতে হয়।
প্রকল্পটির মুখ্য গবেষক অধ্যাপক আলী রীয়াজ উল্লিখিত প্রবণতাসমূহকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং গুরুতর রকমের আশঙ্কাজনক বলে বর্ণনা করে বলেন, এই প্রবণতা দেখাচ্ছে যে কীভাবে একটি আইন উদ্ভূত কর্তৃত্ববাদের দিকে অগ্রসরমান শাসনের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। এটি ভিন্নমতকে অপরাধে পরিণত করছে। তিনি বলেন, আইনের নির্বিচার ব্যবহার বাংলাদেশে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আইনটি বাতিল করা জরুরি।
উল্লেখ্য, পটভূমি: তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন (ওঈঞ অপঃ)- এর (২০১৩ সালে সংশোধিত হিসাবে) ৫টি বিতর্কিত ধারা বাতিলের পর বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ কর্তৃক ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ পাস হয়। আইনটির ৫৪, ৫৫, ৫৬, ৫৭, এবং ৬৬ নং ধারাসমূহ মানবাধিকার সংস্থাসমূহ, শিক্ষার্থী, নাগরিক সংগঠন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দ্বারা তীব্রভাবে সমালোচিত হয়। অবশেষে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ১লা অক্টোবর, ২০১৮ থেকে কার্যকর করা হয়।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন- এর বৈশিষ্ট্যসমূহ সংজ্ঞায়িতকরণঃ এই আইন সরকারকে কোনো ব্যক্তির ক্রিয়াকলাপকে ‘হুমকি’ বলে গণ্য করার বিষয়ে ক্ষমতা প্রদান করার পাশাপাশি সেই বিষয়ে তদন্ত শুরু করার জন্য সরকারকে সম্পূর্ণ ক্ষমতা প্রদান করে। আইনটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে কোনো প্রকার পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেপ্তারের ক্ষমতা প্রদান করে কেবল এই সন্দেহে যে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। এটি পুলিশকে কোনো প্রকার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং সঠিক তত্ত্বাবধান ছাড়াই অনুসন্ধান এবং জব্দ করার ক্ষমতা প্রদান করে। এছাড়াও, আইনটি সরকারকে ইন্টারনেটে প্রয়োজনীয় তথ্য বা ডেটা অপসারণ এবং অবরোধ করার আদেশ দেওয়ার অনুমতি দেয়, যার ফলে সরকারের নীতির সমালোচকদের বা যারা দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য উপস্থাপন করে তাদের কণ্ঠরোধ করার পথ তৈরি হয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ কার্যকর হওয়ার পর থেকে সাংবাদিক, সামাজিক ও মানবাধিকারকর্মী, শিক্ষাবিদ, সুশীল সমাজের সদস্য, কূটনীতিক এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন এই আইনের নয়টি ধারা নিয়ে তীব্র আপত্তি জানায়, যাকে তারা বাকস্বাধীনতার জন্য ক্ষতিকর বলে বর্ণনা করেছে। আইনের এই ধারাসমূহ হলো- ৮, ২১, ২৫, ২৮, ২৯, ৩১, ৩২, ৪৩, এবং ৫৩। তারা আরও জোর দিয়ে বলেছে যে, আইনের এই ধারাগুলো অস্পষ্ট এবং এর অনেকগুলো দিক সঠিকভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয় নি। আইনের ২০টি ধারার মধ্যে যেগুলো অপরাধ এবং শাস্তি নিয়ে কাজ করে, তাদের মধ্যে ১৪টি অ-জামিনযোগ্য। এছাড়া পাঁচটি জামিনযোগ্য এবং একটি আলোচনা-সাপেক্ষ। এই আইনের আওতায় সর্বনিম্ন শাস্তি ১ বছরের কারাদ- এবং সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই শাস্তির মেয়াদ হয়ে থাকে ৪ থেকে ৭ বছরের মধ্যে। সম্পাদক এবং সাংবাদিকরা এই পরিস্থিতিকে ভয়ের পরিবেশ তৈরির পাঁয়তারা হিসাবে দেখেছেন। আইনের অ-জামিনযোগ্য বিধান কার্যত অভিযুক্তকে অনির্দিষ্টকালের জন্য আটক রাখার অনুমতি দেয়।
News Courtesy: