দেশে আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে গুম, ক্রসফায়ারের মতো ঘটনা বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করেছেন একটি ওয়েবিনারে অংশ নেয়া বক্তারা। গতকাল সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) এই ওয়েবিনারের আয়োজন করে। ‘কোথায় আছেন তারা? বাংলাদেশে গুমের ঘটনা’ শীর্ষক ওয়েবিনারে সিজিএস জানায়, ২০১৯ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত পরবর্তী তিন বছরে ৭১টি গুমের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস)। এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণার বরাত দিয়ে সিজিএস বলছে, এই তিন বছরে রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা গুমের শিকার হয়েছেন সবচেয়ে বেশি।
ওয়েবিনারে গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন গবেষণা কার্যক্রমের মুখ্য গবেষক, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং সিজিএস’র উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ড. আলী রীয়াজ। সিজিএস’র গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক দশক বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার হিসাব অনুযায়ী ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সর্বমোট ৫২২ ব্যক্তি গুমের শিকার হন।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ৭১টি গুমের ঘটনা ঘটে। সেগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ৭১ জনের মধ্যে ১৬ জন এখনো নিখোঁজ এবং ৫ জন হত্যার শিকার হয়েছেন। এ ছাড়া ২২ জনকে পরবর্তীতে আটক কিংবা গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো হয়েছে। ২৩ জন গুম হওয়ার পর ফেরত এসেছে এবং ৫ জন সম্পর্কে কোনো তথ্য জানাতে পারেনি সিজিএস। তবে যে ৫১ জনের পেশা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেছে তাতে দেখা গেছে রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা গুমের শিকার হয়েছে সবচেয়ে বেশি। এই দুই পেশার ১১ জন করে গুমের শিকার হয়েছেন।
ড. আলী রীয়াজের নেতৃত্বে গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে শুরু হওয়া এই গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের ডিসেম্বর তিন বছর সময়কাল পর্যন্ত গুমের শিকার ব্যক্তিদের নিয়ে একটি গবেষণা করা হয়। এই সময়ের মধ্যে ৭১ জন ব্যক্তির গুম হওয়ার ঘটনা শনাক্ত করা হয়। যারা কমপক্ষে দু’দিন নিখোঁজ ছিলেন। এ ছাড়া অধিকারের তথ্যমতে, ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মোট ৫২২ জন ব্যক্তি গুমের শিকার হয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য মতে, ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মোট ৩৭৮ জন ব্যক্তি গুমের শিকার হয়েছেন বলে এই গবেষণায় তুলে ধরা হয়।
সিজিএস’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫২টি গুমের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় পড়া এলিট ফোর্স র?্যাব ২১টি এবং ডিবি ১৬টি ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া সিআইডিসহ নানা বাহিনীর জড়িত থাকারও অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় সবচেয়ে বেশি ২৬টি গুমের ঘটনা ঘটেছে। আর গত বছরের জুনে সবচেয়ে বেশি ৮ জন ব্যক্তি গুমের শিকার হয়েছেন। বর্তমান সরকার পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর ২০১৯ সাল থেকে পরবর্তী তিন বছরে ৭১টি গুমের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস)। এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণার বরাত দিয়ে সিজিএস বলছে, এই তিন বছরে রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা গুমের শিকার হয়েছেন সবচেয়ে বেশি।
আলোচনায় অংশ নিয়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী কমিটির সদস্য নূর খান বলেন, নির্বাচনের আগে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীরা এম্বুলেন্সে করে পালিয়ে যাওয়ার সময় গাড়ি থেকে নামিয়ে তুলে নেয়া এবং পরবর্তীতে তাদের লাশ খুঁজে না পাওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। গুমের শিকার ব্যক্তিরা ফেরত আসার পরে তাদের অনেকের বর্ণনা থেকে এটাই স্পষ্ট রাষ্ট্রের ভেতরে দেশের অভ্যন্তরে এমন কিছু স্থান আছে যেটা এক ধরনের গোপন কারাগার হিসেবে গড়ে উঠেছে। আরও ব্যাপক গবেষণার মাধ্যমে এই স্থানগুলো সম্পর্কে আমাদের একটি ধারণা আনতে হবে। আগামী ২০২৩ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে জঙ্গি উথানের একটি পর্ব দেখানোর চেষ্টা হতে পারে।
এটাকে কেন্দ্র করে দেশে অনেক মানুষ গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও ক্রসফায়ারের শিকার হতে পারেন। এবং একটি পরিস্থিতি তৈরি করার চেষ্টা হতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার মধ্যদিয়ে গুমের ঘটনা খানিক সময়ের জন্য কমে এসেছে। কিন্তু তার মানে বলার সুযোগ নেই যে, এই ঘটনা আবার ঘটবে না। এই নিষেধাজ্ঞার মধ্যে দিয়ে আমরা দেখছি কমে এসেছে। পাশাপাশি এ ধরনের গুম, খুন কমে গেছে এটি বলার কোনো সুযোগ নেই।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, যারা গুম হচ্ছে তারা খুন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হচ্ছেন। বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং গুম একই সূত্রে গাঁথা। ক্ষমতাসীনরা তাদের অবৈধ সম্পদ রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করতে দেখা গেছে। ক্ষেত্রবিশেষে তারা গুমের ঘটনা ঘটিয়ে থাকে। তিনি বলেন, প্রাইভেটাইজেশন ভায়োলেশন বা দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নে জড়িত ব্যক্তিরা এক্ষেত্রে গুম-খুনের ঘটায় তাদের ভাড়া করা কিংবা নিজেদের সৃষ্টি করা বাহিনী ব্যবহার করে।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে গুমটাকে ব্যবহার করা হচ্ছে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে এই (গুম) সমস্যা আরও প্রকট হবে। আরেকটি কারণে রাজনৈতিক এবং ব্যবসায়ীক উদ্দেশ্যে এটা ব্যবহৃত হচ্ছে। দুর্নীতির কারণে যারা এখন বিরাট অর্থ-বিত্তের মালিক হয়েছেন তারা তাদের সম্পত্তি রক্ষা করতে ব্যক্তিগত বাহিনী তৈরি করছে। এবং তারা সরকারি বাহিনীকে ব্যবহার করছে। এটা আমাদেরকে একটি বেসামাল পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেন, যারা গুম থেকে ফিরে এসেছে তাদের পরিবাররা কেন কথা বলতে চায় না। কেন চায় না, সেটাও বলতে চায় না। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট থানাগুলো এবং এগুলো বিশ্লেষণ করলে অনেক বিশাল একটা তথ্য পাওয়া যাবে। যেটা বোঝাটা প্রয়োজন যে কি পরিমাণ ভীতির কারণে গুমের শিকার ব্যক্তিরা কথা বলতে চায় না। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পরে এই ঘটনাগুলো কমেছে। কারণটা কি। এখানে একটিই কারণ হতে পারে যারা নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পড়েছে তাদের অবাধ যাতায়াতসহ ব্যক্তিগত অসুবিধার আশঙ্কা থেকে গুমের মতো ঘটনা বন্ধ রাখা হয়েছে। এবং আমার আশঙ্কা যখন আন্তর্জাতিক এই চাপ কমে যাবে তখন আবার পুরোদমে গুম শুরু হবে। বিশেষ করে নির্বাচনের আগে।
বেলা’র নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, গুম হওয়া মানুষেরা কোথায় যায় এটা আমরা সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারবো না। তবে কেন তারা যায় (গুম হয়) সে বিষয়ে বলতে গেলে এই প্রক্রিয়াটিকে আসলে রাজনৈতিক বলা ভুল কিছু না। মানুষের মধ্যে একটি আতঙ্কের আবহ ছড়িয়ে দিয়ে ক্ষমতায় থাকাটাই কেন জানি মনে হয় এই প্রক্রিয়ার একমাত্র কারণ। বিরুদ্ধ মত যেন কোনোভাবেই প্রকাশিত না হয়। সরকারের যে অন্যায়, অবিচারগুলো আছে তাদের মাত্রা অতিক্রম করে যাওয়ার বিষয়গুলো আছে সেগুলো যেন নাগরিকেরা কথা বলতে না পারেন সে জন্যই আসলে এই উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। ভীতির আবহ ছড়িয়ে দিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে যদি এমন নগ্নভাবে ব্যবহার করা হয় যে ব্যবহার হলে আমাদের দেশের নাগরিকদের ভূমিকা কি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা তাহলে কি হলো। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সিজিএস’র নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমান।
News Courtesy: