জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সংবিধান সংস্কারের যে জনআকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা উপেক্ষা করা হলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমে যেতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ তাজুল ইসলাম।
তিনি বলেন, জনগণ রাষ্ট্রের সব ক্ষমতার মালিক। তাই গণভোটে কোনো পরিবর্তনের পক্ষে রায় এলে সেই জনমত বাস্তবায়ন না করা জনগণের ইচ্ছার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এতে গণতন্ত্র দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
শনিবার (০৮ আগস্ট) রাজধানীর সিরডাপের চামেলী হাউস মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘রিফর্ম ওয়াচ’র আওতায় ‘সংস্কার কোথায় দাঁড়িয়ে? অগ্রগতি, বাধা ও করণীয়’ শীর্ষক সংলাপে মুহাম্মদ তাজুল ইসলাম এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর মানুষের মধ্যে রাষ্ট্রব্যবস্থা, সংবিধান ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মৌলিক সংস্কারের যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, সেটিই বর্তমান সংস্কার আলোচনার মূল ভিত্তি। দীর্ঘ সময়ের শাসনব্যবস্থার অভিজ্ঞতা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর বলেন, বিভিন্ন সংস্কার কমিশন তাদের প্রতিবেদন দিয়েছে। এরপর জুলাই সনদে রাজনৈতিক দলগুলো স্বাক্ষর করেছে। এর মাধ্যমে একটি সর্বদলীয় আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ ঘটেছে। পরে গণভোটের মাধ্যমে এর আরও বৈধতা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে জনগণের রায়ের ভিত্তিতে যে পরিবর্তনের দাবি উঠেছে, সেটিকে অস্বীকার করা উচিত নয়।
তিনি বলেন, সংবিধানের সপ্তম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ। জনগণ যদি রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের দাবি জানায় এবং সেই দাবির পক্ষে গণভোটের রায় আসে, তাহলে সেই ম্যান্ডেটকে উপেক্ষা করা জনগণের ইচ্ছার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে।
সতর্ক করে তাজুল ইসলাম বলেন, জনগণের ভোটের রায় বাস্তবায়ন না হলে একসময় মানুষের মধ্যে ধারণা তৈরি হতে পারে যে, ভোট দিয়ে কোনো পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। এতে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রবিমুখ হওয়ার পাশাপাশি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। এমন পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক রাজনৈতিক প্রবণতার জন্ম দিতে পারে।
সংবিধান সংশোধন ও সংস্কারের মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরে তিনি বলেন, শুধু সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে জুলাই সনদের অনেক প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হলে ভবিষ্যতে সেগুলো আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। কারণ সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায়ে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সংসদের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
তাজুল ইসলাম আরো বলেন, সংবিধান সংস্কারের জন্য বিশেষ কাঠামো বা সংবিধান সংস্কার পরিষদকে গণপরিষদের মতো দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। জনগণের প্রত্যক্ষ রায়ের ভিত্তিতে এ ধরনের পরিবর্তন আনা হলে তা আইনগতভাবে আরও শক্তিশালী ভিত্তি পাবে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হলেও সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়, বিচারক নিয়োগ ও দুর্নীতি দমন কমিশনসংক্রান্ত কিছু অধ্যাদেশের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কেন এসব উদ্যোগের ধারাবাহিকতা বজায় থাকল না, সরকারের কাছ থেকে তার ব্যাখ্যা পাওয়া প্রয়োজন।
তাজুল ইসলাম বলেন, রাজনীতি এবং ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার নামই গণতন্ত্র। তাই রাষ্ট্র সংস্কারের নামে যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, সেসবের কারণ ও উদ্দেশ্য জনগণের কাছে স্পষ্ট করা দরকার।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য, গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগ এবং প্রধান বিচারপতি ও নির্বাচন কমিশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগপ্রক্রিয়া আরও স্বাধীন ও স্বচ্ছ করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী প্রয়োজন হলে বাছাই কমিশনের মাধ্যমে এসব নিয়োগ দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে বলেও মন্তব্য করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর।
পুলিশ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তাজুল ইসলাম বলেন, শুধু কাঠামোগত পরিবর্তন করলেই হবে না, পুলিশের মানসিকতা, প্রশিক্ষণ ও মৌলিক জ্ঞানেও পরিবর্তন আনতে হবে। জনগণের বন্ধু হিসেবে পুলিশের ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে।
জুলাই অভ্যুত্থানের সময় পুলিশের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে তিনি বলেন, আন্দোলন দমনের নামে আহত ব্যক্তিকে গুলি করা, বাড়িতে ঢুকে গুলি করা বা আটক ব্যক্তির সঙ্গে নিষ্ঠুর আচরণ কোনোভাবেই পুলিশের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে পুলিশের আচরণ ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন।
পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্তে স্বাধীন সংস্থার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো বাহিনীর বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ উঠলে সেই বাহিনীর নিজেদের দিয়ে তদন্ত করানো যুক্তিসংগত নয়। গুমসহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের তদন্তেও স্বাধীন ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন।
তাজুল ইসলাম বলেন, রাষ্ট্র সংস্কারের সুযোগকে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব হিসেবে দেখা উচিত। এ সংস্কার বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ পেতে পারে। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি জবাবদিহিমূলক, গণতান্ত্রিক ও কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে এখনই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
News Courtesy: