Centre for Governance Studies, Dhaka

CGS in the media

অধিকার ও সম্মানের স্বীকৃতি ছাড়া প্রকৃত অন্তর্ভুক্তি সম্ভব নয়

Press clipping reproduced from the original publication, as archived on the CGS website.

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর পাশাপাশি সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের কার্যকর ক্ষমতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন রাজনৈতিক নেতা, শিক্ষাবিদ, অধিকারকর্মী, আইনজীবী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। বক্তারা বলেছেন, শুধু অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করলেই অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি প্রতিষ্ঠা হবে না; নারী, তরুণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার, পরিচয় ও পারস্পরিক সম্মানের স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে হবে।

বৃহস্পতিবার (১৮ আগস্ট) ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) ও নেদারল্যান্ডস রাজ্যের দূতাবাসের সহযোগিতায় আয়োজিত ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্ব: রাজনীতিতে নারী ও তরুণ’ শীর্ষক গোলটেবিল সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন।

সিজিএসের প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংলাপে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ছাত্র সংগঠন, শিক্ষাবিদ, অধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতে জিল্লুর রহমান বলেন, প্রকৃত অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে শুধু অংশগ্রহণ নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নারীদের কার্যকর ক্ষমতা দিতে হবে। প্রয়োজনের সময় নারীদের সামনে রাখা হলেও ক্ষমতার কাঠামোতে তাদের যথাযথ জায়গা দেওয়া হয় না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ও প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর বলেন, জুলাই আন্দোলনে নারী ও তরুণদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও পরবর্তী সময়ে তাদের যথাযথ স্বীকৃতি ও রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত হয়নি। তরুণদের আরও বড় পরিসরে ক্ষমতায়নের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, তরুণদের শুধু আন্দোলনের শক্তি হিসেবে নয়, রাষ্ট্র পরিচালনা ও নীতিনির্ধারণের অংশ হিসেবেও প্রস্তুত করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থান, বিদেশে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি এবং সাইবার আইন সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান বলেন, তরুণদের শুধু ক্ষমতার কেন্দ্রে নেওয়াই যথেষ্ট নয়, তাদের দায়িত্বশীল নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত করতে হবে। একই সঙ্গে নারীদের চরিত্রহনন ও বিদ্রূপের সংস্কৃতি বন্ধ করে তাদের মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

গণফোরামের সভাপতি সুব্রত চৌধুরী বলেন, রাজনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত জনগণের স্বার্থ রক্ষা। অতীতকে অস্বীকার না করে তরুণদের সামনে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি প্রবীণ রাজনীতিকদের অভিজ্ঞতাকেও কাজে লাগাতে হবে।

জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, সংসদে তরুণদের পর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্ব না থাকা রাজনৈতিক ব্যর্থতা। অভিজ্ঞ রাজনীতিকদের সঙ্গে তরুণদের কাজের সুযোগ তৈরি করতে হবে। স্থানীয় সরকারে নারীর প্রতিনিধিত্ব থাকলেও তাদের কার্যকর ক্ষমতা ও প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল কাফি রতন বলেন, বৈচিত্র্য ও ক্ষুদ্র জাতিসত্তার অধিকার স্বীকার করে নারী ও তরুণদের রাজনৈতিক নেতৃত্বে যুক্ত করতে হবে। জাতীয় সংসদে নারীদের সরাসরি নির্বাচনের সুযোগ এবং রাজনৈতিক পদে বয়সসীমা নির্ধারণের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

বাসদের সহকারী সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, সমাজের বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দিয়ে সবার নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। নারী-পুরুষ, তরুণ ও প্রবীণের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান ও মর্যাদার সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

গণসংহতি আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য তাসলিমা আখতার বলেন, প্রবীণদের অভিজ্ঞতা ও তরুণদের সক্ষমতার সমন্বয়েই টেকসই পরিবর্তন সম্ভব। তরুণদের পরিবর্তনের শক্তি হিসেবে ধরে রাখার পাশাপাশি দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ দিতে হবে।

এবি পার্টির নাসরীন সুলতানা (মিলি) বলেন, স্কুল কমিটি থেকে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত নারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ এখনো সীমিত। রাজনৈতিক কাঠামোর সব স্তরে নারীদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী বলেন, দীর্ঘ সময় দেশে নারী নেতৃত্বে সরকার থাকলেও জাতীয় রাজনীতিতে নারীদের কাঙ্ক্ষিত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়নি। তরুণদের কর্মসংস্থান ও নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রেও আরও অগ্রগতি প্রয়োজন।

জি-৯-এর সাধারণ সম্পাদক ডা. সাখাওয়াত হোসাইন সায়ান্থ বলেন, ছাত্ররাজনীতির ঝুঁকি এবং অর্থ ও পেশিশক্তির প্রভাবের কারণে অনেক মেধাবী তরুণ রাজনীতি থেকে দূরে থাকছেন। রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন স্তরে নারী ও তরুণদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।

ট্রান্স ফেমিনিস্ট ও জেন্ডার অধিকারকর্মী হো চি মিন ইসলাম বলেন, অন্তর্ভুক্তি মানে সবার সমান অধিকার ও সুযোগ নিশ্চিত করা। অধিকার, পরিচয় ও পারস্পরিক সম্মানের স্বীকৃতি ছাড়া প্রকৃত অন্তর্ভুক্তি সম্ভব নয়।

দ্য ইরাবতীর বাংলাদেশ প্রতিনিধি মো. মুক্তাদির রশিদ রোমিও বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে আস্থার সংকট অন্যতম বড় সমস্যা। নারীদের সাইবার হয়রানি প্রতিরোধ, তৃণমূলে নারী নেতৃত্ব বৃদ্ধি এবং তরুণদের উদ্ভাবনী শক্তির সঙ্গে প্রবীণদের অভিজ্ঞতার সমন্বয় জরুরি।

ডাকসুর নির্বাহী সদস্য হেমা চাকমা বলেন, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর পরিচয়ের স্বীকৃতি, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তর থেকেই নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

এনসিপির জুবাইরুল হাসান আরিফ বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে নারী ও তরুণদের জন্য আরও জায়গা তৈরি করতে হবে। রাজনীতিতে পেশিশক্তি ও পরিবারতন্ত্র কমিয়ে কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।

ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশের সাইফ মোহাম্মদ আলাউদ্দিন বলেন, তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা জরুরি। নারীদের অংশগ্রহণের জন্য নিরাপদ পরিবেশ এবং ডিজিটাল সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

ছাত্রদলের আবিদুর রহমান মিশু বলেন, রাজনৈতিক সংগঠনগুলোতে নারীদের নেতৃত্বে আনার কাঠামো পরিবর্তন করতে হবে। সাইবার বুলিং ও হয়রানি নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর ইসরাত জাহান ইমু বলেন, জুলাইয়ের আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা থাকলেও কর্মক্ষেত্র ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়নি। পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো ও বুলিং এখনো নারীদের অগ্রযাত্রায় বাধা সৃষ্টি করছে।

বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের আরমানুল হক বলেন, আন্দোলনের সময় নারীদের সামনে রাখা হলেও ক্ষমতার কাঠামোতে তাদের পিছিয়ে দেওয়া হয়। নারী, আদিবাসী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য রাজনৈতিক দলের কাঠামোর মধ্যেই কার্যকর সুযোগ তৈরি করতে হবে।

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রী সংস্থার রাইসা রিফাত জুইন বলেন, বয়সের কারণে তরুণদের অবমূল্যায়ন করা হয়। একইভাবে নারীদের তৃণমূল থেকে রাজনৈতিক নেতৃত্বে উঠে আসার কার্যকর পথও সীমিত। তাই অন্তর্ভুক্তি শুধু সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে অর্থবহ করতে হবে।

বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের তিলোত্তমা ইতি বলেন, নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে অনীহার কারণে মনোনয়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয় না। বিশেষ করে প্রান্তিক নারী ও সংরক্ষিত আসনের প্রতিনিধিদের কার্যকরভাবে কাজ করার সুযোগ বাড়াতে হবে।

সংলাপে বক্তারা রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক চর্চা জোরদার, নারী ও তরুণদের জন্য নিরাপদ রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি, সাইবার হয়রানি বন্ধ, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সব পর্যায়ে তাদের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।

News Courtesy:

অধিকার ও সম্মানের স্বীকৃতি ছাড়া প্রকৃত অন্তর্ভুক্তি সম্ভব নয় – Bangla Affairs