Centre for Governance Studies, Dhaka

Analysis

নির্বাচন কি আফগানিস্তানে প্রশান্তির পথ প্রশস্ত করবে?

তালিবানদের কঠোর হুমকি এবং দেশব্যাপী ভয়াবহ নাশকতামূলক  কার্যকলাপ কে উপেক্ষা করে, গত ২৮শে সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়ে গেল আফগানিস্তানে। ২০০১ সালে তালিবানের পতনের পর, এটি চতুর্থ নির্বাচন। এ আঠারো বছরে পুরদস্তুর সাবালক না হলেও, কিছুটা স্বাবলম্বী হয়েছে কাবুল। গণতন্ত্রে আশা দেখেছে জনগণ – যদিও দ্বন্দ্ব বেড়েছে রাজনীতিতে। বাতাস ভারী হয়েছে উগ্র বারুদের তীব্রতায়।  মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক মানুষ এখানে দিন যাপন করেন অকল্পনীয় দীনতার সঙ্গে। প্রতিদিন মাত্র এক ডলারের কম ব্যয়ে বেঁচে আছেন তারা। শান্তির প্রতীক্ষায় সাড়ে তিন কোটির উপর অধিবাসী আছেন রাষ্ট্রনেতাদের মুখ চেয়ে। যুদ্ধদীর্ণ এদেশে, শেষ আর্থিক বছরে জিডিপি বেড়েছে মাত্র ২.৫ শতাংশ হারে। শান্তি নিয়ে আলোচনা চলেছে দফায় দফায়। কাবুল থেকে কাতার। কাতার থেকে রাশিয়া। স্থান পালটেছে। বদলেছে মুখ। পরিস্থিতি পাল্টায়নি।  

 যুদ্ধ এখানে ঘটমান বর্তমান। শান্তি ফেরাতে হিমসিম খাচ্ছে মার্কিন সরকারও। প্রায় ১ লাখ সৈন্য কমিয়ে এনে, বর্তমানে চোদ্দ হাজার  সেনা মোতায়েন রেখেছে পেন্টাগন।  সাবেক রাষ্ট্রদূত জালমে খলিলাজাদকে বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ করেছে হোয়াইট হাউস। ওয়াশিংটন এপর্যন্ত প্রায় ৮০০ বিলিয়ন খরচ করেছে আফগানিস্তানে। আফগানিস্তানের পুনর্নির্মাণে নানা ভাবে, নানা খাতে বহু-বিলিয়ন ডলারের সাহায্য করেছে  আফগান-হিতৈষী ভারত । সংসদ ভবন,  ক্রিকেট স্টেডিয়াম, হাসপাতাল, বিদ্যালয় নির্মাণ থেকে সামরিক সরঞ্জাম, হেলিকপ্টার, আম্বুলেন্স, বাস  দান করে  আফগানিস্তানকে ঋজু হতে  সহায়তা করেছে নতুন দিল্লী। 

 নির্বাচন ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা

 প্রাজ্ঞ, পোড় খাওয়া, বিদগ্ধ-বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ থেকে শল্য চিকিৎসক, অধ্যাপক, ব্যবসায়ী, বিচ্ছিন্নতাবাদী ও মৌলবাদী নেতা – সব মিলিয়ে পনেরো জন ছিলেন এবারের নির্বাচনের প্র্রতিদ্বন্দ্বীতায়। দেশীয় রাজনীতিতে, এই জনপ্রতিনিধিরা  বাড়িয়ে দিয়েছেন বহুত্ববাদের পরিধি। প্রথমেই আছেন রাষ্ট্রপতি ঘানি – যিনি প্রত্যাবর্তনের প্রত্যাশী। একদা মার্কিন নাগরিকত্ব এবং নৃতত্ববিদের চাকরি ছেড়ে, দেশে ফিরে আসেন গণতন্ত্রের ভিত মজবুত করার অভিপ্রায়ে। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ পাশতুন জনজাতির মানুষ তিনি। ঘানির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মুখ্য কার্যনির্বাহী আধিকারিক (চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার) আবদুল্লাহ আবদুল্লাহ। বর্ষীয়ান, তাজিক এই নেতা তিন বার প্রতিদ্বন্দ্বীতা করলেন এই নিয়ে। দুই প্রধান জনগোষ্ঠী পাশতুন ও তাজিক বাদে, হাজারা ও উজবেক সম্পদায়ের জনসংখ্যার সমন্বয় হল মোট জনসংখ্যার  প্রায়  ২০ শতাংশ। তাদের সমর্থন পেতে নানা কৌশল অবলম্বন করেছেন যুযুধান দুই প্রতিপক্ষ।   

তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বী প্রাক্তন গোয়েন্দা প্রধান রাহমতুল্লা নাবিল। নাম উহ্য রেখে, নাবিল রাষ্ট্রপতি ঘানির ১৭৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করা প্রচারের সমলোচলনা করেছেন। পাশতুন ভাষী প্রৌঢ় নাবিল, তালিবানদের এবং তাদের মদতদাতা পাকিস্তানের ঘোরতর বিরোধী। প্রখ্যাত আফগান নেতা আহমেদ শা মাসুদের ছোট ভাই আহমেদ ওয়ালী মাসুদ  জমা দিয়েছেন মনোনয়ন। কূটনীতিবিদ এবং জামিয়াত ই ইসলামীর এই নেতা একজন তাজিক।  বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মকাণ্ডের জন্য কুখ্যাত হেজব ই ইসলামীর নেতা গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ারও এ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী। অধ্যাপনার আঙিনা থেকে উঠে এসেছেন প্রার্থী মহম্মদ সাহাব হাকিমি ।তালিবান আমলের পররাষ্ট্র  মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব সামলেছেন, আরেক প্রার্থী সম্ভ্রান্ত ব্যবসায়ী নুরুল্লা জলিলি। ভোটে দাঁড়িয়েছেন  পেশায় চিকিৎসক গুলাম ফারুক নাজরাবী ।

প্রায় সব রাজনৈতিক প্রার্থীর নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল দেশে শান্তি ফেরানো। তবে কট্টর মৌলবাদীদের ব্যাপারে শিথিল হতে দেখা যায় প্রার্থীদের।

 নির্বাচনঃ ব্যালট -বুলেটের সংঘাত

দক্ষিণ এশিয়ার জলবায়ু, খুব সম্ভবত, অবাধ, সুষ্ঠু, নির্বিঘ্ন ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রতিপন্থী। যুদ্ধ-বিধ্বস্ত  আফগানিস্তান নির্বাচনে হামালার ও অচলাবস্থার আশঙ্কা  ছিল খুব স্বাভাবিক ভাবেই। ২৮ শে সেপ্টেম্বর যুদ্ধ ছিল ব্যালটের সঙ্গে বুলেটের ।

দু’বার বিলম্বিত এই নির্বাচনে, ভোট পড়েছে ২৫ লাখ। মাত্র কুড়ি শতাংশ। ৭০ লাখ ভোট পড়েছিল ২০১৪ সালে। এবারের নির্বাচনে ভীত ও সন্ত্রস্ত ছিলেন নির্বাচনদাতারা। ইতিপূর্বে, ভোটারদের আঙ্গুল কেটে নেয় তালিবান। সেই আঙ্গুল কাটা হাত নিয়ে এবার আবারও ভোট দিয়েছেন নিপীড়িত ভোটার। খর্ব করা যায়নি স্পর্ধা, হরণ করা যায়নি তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। ভারতে  পড়তে আসা বালখ, গজনী, পারয়ান জেলার  আফগানরা – এ প্রতিবেদকের সঙ্গে স্মৃতিচারণ করে, তাদের দেশে চলা নরকীয় নৃশংসতার কথা। জানায়, শুধুমাত্র সন্দেহের বশে, কিভাবে সরকারী কর্মীর মস্তক-চ্ছেদন করে তালিবানরা।    

প্রধান প্রধান শহর এবং জেলা সদর শহর গুলির বাইরে আছে এক বৃহৎ গ্রামীণ আফগানিস্তান। যা এখনও প্রশাসনের আয়ত্তের বাইরে। তালিবানই সেখানে শেষ কথা বলে। এক সমান্তরাল প্রশাসন চলে সে নৈরাজ্যে। জন্মলগ্ন থেকেই পাকিস্তানের সেনাবাহিনী তালিবানীদের  বর্বরতার মদত দিয়ে আসছে। প্রকাশ্যে এবং আঁধারে।

সরকারী নির্বাচনী দপ্তর ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইলেকশান কমিশন ওফ আফগানিস্তান। প্রথমে ৯৬ লাখ নিবন্ধিত ভোটারের কথা জানায় – যার মধ্যে ৩৩ লাখ নারী। পরে জানা যায় প্রায় এক কোটি ষাট লাখ নাগরিকের ভোটাধিকার ছিল। আফগানিস্তানের জনপ্রিয় চ্যানেল টোলো নিঊজের সম্প্রচারিত তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী কাবুলে ৫৫৭টি সেন্টারে ভোট দিয়েছেন আটান্ন হাজারের  কিছু বেশী নাগরিক। কান্দাহারে ১৬৭ টি সেন্টারে ভোট পড়েছে ৯৩,৬২৪। কুন্দুজ, নিমরোজ দুটি প্রদেশেই  মাত্র বারো হাজার করে ভোট পড়েছে। বাদ্ঘিসে ৭৬ টি সেন্টারে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করেন মাত্র ন’হাজার ন’শ একষট্টি জন। গভীর নিরাপত্তায় ঘেরা হয় সব ভোটকেন্দ্র। ৫,৩৭৩ টি সেন্টারের মধ্যে  ৪,৬৬৯ টি মূলত কার্যকরী ছিল। সরকারী নির্বাচনী দপ্তর প্রাথমিক ভাবে ২,৫৯৫,৪৪৫ টি ভোট পড়ার কথা প্রকাশ করে।

বায়োমেট্রিক পদ্ধতি ছিল এবারের নির্বাচনের বিশেস্বত্ব। তবে গ্রাম্য মহিলারা ছবি তুলতে নিমরাজি হওয়ায়, শেষ মুহূর্তে কিছুটা শিথিল হয় নির্বাচন কমিশন। ছিল প্রকৌশলগত (টেকনিকাল) গোলযোগ। এসেছে কারচুপির অভিযোগও। ১৫০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হয় এ নির্বাচনে, যাতে বৈদেশিক আর্থিক অনুদান ছিল ৬০ মিলিয়নের কাছাকাছি। কোনরকম অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, বাহাত্তর হাজারের উপর অতিরিক্ত সেনা এবং পুলিশ মোতায়েন করা হয়। ছিল ন্যাটো বাহিনিও।বিভিন্ন প্রদেশে প্রায় দুই শতাধিক বিচ্ছিন্ন হামলায় প্রাণ হারান কুড়ি জন পুলিশ কর্মী এবং নয় জন সাধারণ নাগরিক।

চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করা হবে  আগামী ৭ই নভেম্বর । নির্বাচনোত্তর পর্যায়ে, ঘানি ও আবদুল্লাহ দুজনেই জয়ী হিসেবে দাবী করেছেন। সাত হাজার মানুষকে নিয়ে সমীক্ষা করে, আবদুল্লাহ আবদুল্লাহর জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্ট ইলেকশন ফাউন্ডেশন অফ আফগানিস্তান ৷ অরেক সমীক্ষা বলছে ঘানির প্রত্যাবর্তনের কথা। আফগান সংবিধান অনুযায়ী, কোনো প্রার্থী ৫০ শতাংশের বেশি ভোট না পেলে দ্বিতীয় দফা ভোট হবে।

নির্বাচন শান্তি ও নিরাপত্তা আনবে?  

ঘানি সরকারের শান্তিদুত ওমর দাউদজাই, নির্বাচনের ঠিক পর পর  একটি টুইট বার্তায় জনগণকে শান্তির ব্যাপারে আশ্বস্থ করেন। নির্বাচনের আগে, কাতারের রাজধানী দোহাতে নবম দফার মার্কিন-তালিবানী আলোচনা সেরে, দোসরা সেপ্টেম্বর শান্তির আলোচনায় কাবুল আসেন খলিলাজাদ। সেদিন তালিবানদের সঙ্গে আলোচনায় ঠিক হয়, চার মাসের মধ্যে ৫০০০ মার্কিন সেনা আফগানিস্তান থকে ফিরিয়ে নেওয়া হবে। সেদিনই, খোদ রাজধানীর বুকে ভয়াবহ হামলা চালায় তালিবানরা। বোমার গর্জন, বারুদের আস্ফালন নিরাশ করে শান্তিকামীদের। হামলায় প্রাণ হারান মার্কিন সেনা  এবং আফগান নাগরিক। ভেস্তে যায় শান্তির আলোচনা ।

সম্প্রতি, ২রা অক্টোবর মহাত্মা গান্ধীর জন্মদিনে, ইসলামাবাদ আসেন খলিলাজাদ। তিনি বৈঠক করেন পাক  সরকার এবং তালিবানদের সঙ্গে । সামাজিক মাধ্যমে  দাবানল প্রায় ছড়িয়ে যায় –  পাক বিদেশ মন্ত্রী শা মহম্মদ কূরেশী এবং আই এস আই কর্তা  ফায়েজ হামেদের সঙ্গে তালিবান নেতার নিবিড় আলিঙ্গনের চিত্র। সাবেক তালিবান নেতা সায়িদ আকবর আঘা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মুখপাত্র – অদ্যাবধি আলোচনার ফলাফল নিয়ে কেউই জানান নি কিছু। 

আফগানিস্তানের অচলাবস্থা দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তির অন্তরায়। আফগানিস্তানের দুরূহ-দুস্তর ভূখণ্ডে পা রেখেছ ইসলামিক স্টেট। খুলেছে শাখা। ছড়িয়েছে প্রশাখা। তালিবান ও ইসলামিক স্টেট – দুটি সম্প্রদায়ের মূলত কোন যোগ সাজস নেই। তবে, হাজারা  সম্প্রদায় এই দুই কট্টর মৌলবাদী সংগঠনেরই হামলার প্রধান লক্ষ্য। হাজারা অধ্যুষিত ফতেমিয়ায়ুন নামে এক শিয়া জঙ্গি সংগঠন ফিরে এসেছে আফগানিস্তানে। অন্যদিকে,পাকিস্তানের সামরিক সদর জি এইচ কিউ আফগান মুজাহিদীন বাহিনীকে ব্যবহার করতে পারে পাক-কাশ্মীর থেকে। ভারত-শাসিত কাশ্মীরের শান্তি বিঘ্নিত করতে এবং নাশকতামূলক  কার্যকলাপ চালাতে, নানা মৌলবাদী ও জিহাদি  সংগঠনকে সক্রিয় করতে তারা বদ্ধপরিকর।

গণতন্ত্রের সঙ্গে কট্টর মৌলবাদের  যুদ্ধে  শেষ পর্যন্ত জয়ী হল গণতন্ত্রই। দেখিয়ে দিল এ নির্বাচন।  তবে নির্বাচন কখনও পরিবর্তন আনেনা – যদিনা প্রগতিশীল হন নাগরিক, পরিবর্তন আসে জনগণের মননে এবং চিন্তনে। শুধুমাত্র এই নির্বাচনই যে  আফগানিস্তানকে নিবিড় পেলব-প্রশান্তিময়তা দেবে – তা যেমন অভিপ্রেত নয়, তেমনি এ জনাদেশের মহিমাও উপেক্ষণীয় নয়। গাঢ় নীল কালি মাখা তর্জনীকে উঁচিয়ে, তালিবানদের তথা উগ্র মৌলবাদের হুমকিকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়েছেন আফগান আবাল- বৃদ্ধ-বণিতা। বাঙ্ময় হয়েছে নাগরিক তর্জনী। সে তর্জনী নির্দেশ করেছে এদেশের প্রগতির অভিমুখ।।

অয়নাংশ মৈত্র, ভারতীয় ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ।  

মতামত লেখকের নিজস্ব। 

 

More by অয়নাংশ মৈত্র

How to cite

অয়নাংশ মৈত্র. “নির্বাচন কি আফগানিস্তানে প্রশান্তির পথ প্রশস্ত করবে?.” Centre for Governance Studies, 12 October 2019. https://beta.cgs-bd.com/analysis/%e0%a6%a8%e0%a6%bf%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%9a%e0%a6%a8-%e0%a6%95%e0%a6%bf-%e0%a6%86%e0%a6%ab%e0%a6%97%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a6%bf%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a7%87/