Centre for Governance Studies, Dhaka

Analysis

গার্মেন্টস হোক আর গণপরিষদ: নারীদের ক্ষমতায়নে সেক্টরভিত্তিক বৈষম্য কেন?

বাংলাদেশে নারী ক্ষমতায়ন নিয়ে যখন আলোচনা হয়, তখন প্রায়ই এক দ্বৈত বাস্তবতা চোখে পড়ে। একদিকে গার্মেন্টস খাত, যেখানে প্রায় ৪০ লক্ষাধিক নারী শ্রমিক দিনরাত পরিশ্রম করে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান উৎস নিশ্চিত করছে। অন্যদিকে গণপরিষদ বা রাজনৈতিক কাঠামো, যেখানে নারীরা নীতি নির্ধারণে অংশ নিচ্ছে, কিন্তু ক্ষমতার কাঠামোর ভেতরে প্রভাব বিস্তারে নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছে। এই দুটি প্রেক্ষাপট নারীর ক্ষমতায়নের ভিন্নতর যাত্রা তুলে ধরে, এবং একইসাথে শ্রেণীগত বৈষম্যের গভীর শিকড়ও প্রকাশ করে। শ্রেণীগত বৈষম্যের প্রেক্ষাপট থেকে চিন্তা করলে, বাংলাদেশে নারীদের জীবন ও কর্মক্ষেত্র আর্থসামাজিক বৈষম্যের মাধ্যমে গভীরভাবে প্রভাবিত। গার্মেন্টস খাতের নারী শ্রমিকরা মূলত নিম্ন আয়ের পরিবার থেকে উঠে আসে। তাদের প্রধান সংগ্রাম বেঁচে থাকার, যেখানে শ্রমের বিনিময়ে ন্যায্য মজুরি পাওয়া এবং ন্যূনতম শ্রম অধিকার রক্ষা করাই বড় চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে রাজনৈতিক কাঠামো বা গণপরিষদে অংশগ্রহণকারী নারীরা সাধারণত মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত শ্রেণী থেকে আসেন। তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মূলধন, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং রাজনৈতিক যোগাযোগ তাদের ক্ষমতার কাঠামোতে প্রবেশের সুযোগ দিলেও প্রকৃত ক্ষমতা ভোগের সুযোগ খুব সীমিত। এই বৈষম্যই নারীদের ক্ষমতায়নে দ্বৈত চিত্র উঠে আসে। এখানে শ্রমজীবী নারী লড়াই করে বাঁচতে, আর মধ্যবিত্ত ও অভিজাত শ্রেণীর নারী সংগ্রাম করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে টিকে থাকতে।

উদাহরণস্বরূপ, যদি নারী শ্রমিকের লেন্স থেকে দেখি, গার্মেন্টস শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হলেও শ্রমিক নারীদের অবস্থা এখনও শোষণমুখী। রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রেক্ষাপট থেকে দেখলে, এ খাত শ্রমিক শ্রেণী ও মালিক শ্রেণীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যে বৈষম্যের প্রতীকের চিত্র উঠে আসে। এই বৈষম্যের চিত্রটি এমন যেখানে উৎপাদনের মাধ্য়ম অর্থ্যাৎ শিল্প যন্ত্রের মালিকানা এবং উৎপাদন জনগোষ্ঠীর মধ্য়ে শ্রম বন্টনের ব্যাপক অন্যায্য় চিত্র দৃশ্যমান। বিশেষত নারী শ্রমিকের এই উৎপাদনমুখী শ্রমের সুষম বন্টনে পুরুষের তুলনায় আরো অসম প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে হয়। ফলত, নারী শ্রমিকরা দিনে ১০–১২ ঘণ্টা শ্রম দিলেও তাদের মজুরি প্রায়শই জীবিকা নির্বাহের জন্য যথেষ্ট নয়। তারা ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে বাধা, কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি, স্বাস্থ্যের ঝুঁকি  এবং নিরাপত্তাহীনতার মতো সমস্যার মুখোমুখি হয়। এখানে নারীর ক্ষমতায়ন কেবল কর্মসংস্থানের মাধ্যমে ক্ষয়িষ্ণু অর্থনৈতিক অংশগ্রহণে সীমাবদ্ধ থাকে, কিন্তু প্রকৃত ন্যায্য ক্ষমতার হাতছানি অধরাই থেকে যায়। শ্রমিকরা অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে তুললেও মালিক শ্রেণীর হাতে মূলধন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকে। এক্ষেত্রে মার্কসবাদীরা বিশ্লেষণ করে দেখান যে নারীর ক্ষমতায়নকে শোষণ থেকে মুক্তি না দিলে তা কেবল প্রতীকী থেকে যাবে।

অন্যদিকে, গণপরিষদে নারীর অংশগ্রহণকে লিবারেল ফেমিনিজমের লেন্সে বিশ্লেষণ করা যায়। লিবারেল ফেমিনিজম দাবি করে, নারীর সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হলে তাদের জন্য আইনগত, সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোতে সমতা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশে সংবিধানে নারী-পুরুষ সমতার স্বীকৃতি থাকলেও রাজনৈতিক অঙ্গনে নারীর প্রকৃত ক্ষমতা সীমিত। নারীরা প্রায়ই “সংরক্ষিত আসন”-এর মাধ্যমে সংসদে আসেন, যেখানে তাদের রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্য কম এবং পুরুষ নেতৃত্বের উপর নির্ভরশীলতা বেশি। যদিও নারীরা মন্ত্রিসভায়, প্রশাসনে কিংবা সংসদে স্থান পেয়েছে, তবু সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের প্রভাব প্রায়ই প্রতীকী মাত্রায় সীমাবদ্ধ থাকে যা টোকোনিজম হিসেবে হিসেবে দেখা যায়। যেখানে নারীরা আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় পিছিয়ে কিন্তু প্রকৃত সমাধানে না গিয়ে শুধুমাত্র সমস্যার স্বীকারোক্তি মধ্যে ঘোরপাকে থাকা।

বাংলাদেশের নারী ক্ষমতায়নে বৈষম্যের এই বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গার্মেন্টস খাতের নারী শ্রমিকরা অর্থনৈতিকভাবে অবদান রাখলেও তাদের জীবনে দারিদ্র্য, শোষণ ও নিরাপত্তাহীনতা অব্যাহত। আবার গণপরিষদের নারীরা রাজনৈতিক মঞ্চে দৃশ্যমান হলেও প্রকৃত প্রভাব বিস্তারে তারা পুরুষতান্ত্রিক বাধার মুখোমুখি। এই দ্বৈত বাস্তবতা দেখায়— নারীর ক্ষমতায়ন কেবল কর্মসংস্থান বা রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ক্ষমতা কিভাবে বিতরণ হচ্ছে, সেই কাঠামোই বৈষম্যের মূল উৎস।

এছাড়া, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে নারী ক্ষমতায়নে ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ খুঁজলে দেখবেন, বিভিন্ন সময়ে নারীবাদী আন্দোলনের ব্যাপক জোয়ার উঠেছিলো, যা এখনো চলমান। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বর্তমান বিষয়বস্তুর সাথে বৈশ্বিকভাবে নারীবাদী আন্দোলনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা— মার্কসবাদী ফেমিনিজম ও লিবারেল ফেমিনিজমের মিল খুঁজে পাওয়া যায়। তারা দেখিয়েছে কিভাবে শ্রমের শোষণ নারীদের অর্থনৈতিকভাবে নিপীড়িত করে, আর  আইন ও প্রতিষ্ঠানের ভেতর সমান সুযোগ নিশ্চিতের বয়ান দিয়েও প্রকৃত অন্তুর্ভুক্তিমূলক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে ধারাবাহিক ব্য়র্থতা জিইয়ে রাখা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই দুই ধারা পরস্পর পরিপূরক। গার্মেন্টস খাতে নারীর অবস্থান বিশ্লেষণ করতে গেলে অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রেক্ষাপট  অপরিহার্য, কারণ এটি দেখায় নারীরা অর্থনীতির মেরুদণ্ড হলেও ন্যায্য মজুরির প্রাপ্তে বৈষম্যের শিকার। আবার গণপরিষদে নারীর উপস্থিতি বিশ্লেষণ করতে গেলে লিবারেল ফেমিনিজমের তীক্ষ্ণ নজর প্রয়োজন, কারণ এটি প্রকাশ করে আইনি স্বীকৃতি থাকলেও কাঠামোগত বাধার কারণে নারীরা প্রকৃত সমতা অর্জন করতে পারছে না।

পরিশেষে, শ্রেণীগত বৈষম্য, শোষণ ও কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা দূর করতে না পারলে নারীর ক্ষমতায়ন কেবল সংখ্যার খেলায় সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। তাই প্রয়োজন একটি সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে অর্থনৈতিক শোষণ ভাঙতে মার্কসবাদী বিশ্লেষণ আর রাজনৈতিক কাঠামোয় সমতা আনতে লিবারেল ফেমিনিজম একসাথে কাজ করবে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই সমন্বয়ই নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়নের পথ উন্মুক্ত করতে পারে।

How to cite

শামসুল আরিফ ফাহিম. “গার্মেন্টস হোক আর গণপরিষদ: নারীদের ক্ষমতায়নে সেক্টরভিত্তিক বৈষম্য কেন?.” Centre for Governance Studies, 8 October 2025. https://beta.cgs-bd.com/analysis/%e0%a6%97%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a7%87%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%9f%e0%a6%b8-%e0%a6%b9%e0%a7%8b%e0%a6%95-%e0%a6%86%e0%a6%b0-%e0%a6%97%e0%a6%a3%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%b7/