আমরা বিভিন্ন সময়ে দেখেছি, জাতীয় নির্বাচনের আগে বাংলাদেশে অবস্থানরত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত নানা প্রসঙ্গে কথা বলেন। লক্ষণীয়, একজন রাষ্ট্রদূতের যে কর্মপরিধি, তার মধ্যে অন্য দেশের নির্বাচন নিয়ে কথা বলা ঠিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না।
যেমন ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ঢাকায় নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকির একটি বক্তব্যের পক্ষে-বিপক্ষে বেশ আলোচনা-সমালোচনা চলছে কয়েক দিন ধরে। আমাদের দেশেরই একটি বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত এক আলোচনা অনুষ্ঠানে ১৪ নভেম্বর তিনি অতিথি হয়ে এসেছিলেন। 'মিট দ্য অ্যাম্বাসাডর' নামে ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে জাপানের রাষ্ট্রদূত বলেছেন- 'আমি শুনেছি (গত নির্বাচনে), পুলিশ কর্মকর্তারা নির্বাচনের আগের রাতেই ব্যালট বাক্স ভোট দিয়ে ভর্তি করে ফেলেছেন। এ ধরনের ঘটনা এর আগে অন্য কোনো দেশে আমি শুনিনি। এ ধরনের ঘটনা আর কখনোই দেখতে চায় না জাপান। সরকার আমাদের জানিয়েছে যে, আগামী নির্বাচন অবাধ ও স্বচ্ছ হতে যাচ্ছে। ফলে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এতে অংশগ্রহণ করবে- এটিই আমার আশা।' (সমকাল, ১৪ নভেম্বর, ২০২২)। তিনি আরও বলেছেন, '২০১৮ সালের নির্বাচনের পর জাপান দূতাবাস সহিংসতা নিয়ে একটি বিবৃতি দেয়। এটি ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা। কারণ জাপান কোনো দেশের নির্বাচনের পর বিবৃতি দেয় না।'
এ ক্ষেত্রে বিবেচনার বিষয়, রাষ্ট্রদূত নিজে থেকে অনুষ্ঠান আহ্বান করে, সাংবাদিকদের ডেকে এ বক্তব্য দিয়েছেন কিনা? তা তিনি করেননি। ক্ষেত্রটি আমরাই তৈরি করে দিচ্ছি। কোনো একটি পক্ষ এ ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। তারপর সেখানে বিদেশি কূটনীতিকদের ডেকে সাংবাদিকদের সামনে প্রশ্নের জন্য রাখা হয়। জাপানের রাষ্ট্রদূতের আলোচিত বক্তব্যের ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। অর্থাৎ সুযোগটা আমরাই তৈরি করে দিচ্ছি। আমি মনে করি, এ ধরনের পরিস্থিতি সংশ্নিষ্ট রাষ্টদূতের জন্যও বিব্রতকর হতে পারে; সরকারের জন্য বিব্রতকর তো বটেই। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কোনো দেশের নাগরিকদের জন্যও তা বিব্রতকর হতে বাধ্য। প্রশ্ন হচ্ছে, এ ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা কতটুকু যৌক্তিক?
আমরা যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কথা বলি, সেখানেও দুর্বলতা আছে। কিন্তু দুর্বলতার কারণে কি সেখানে বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের ডেকে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কথা বলতে দেওয়া হবে? কখনোই না। যাঁরা এ সুযোগ করে দেন, তাঁরা যদি একটু ইতিহাসের দিকে তাকান হয়তো বুঝতে পারবেন- এমন প্ল্যাটফর্মে রাষ্ট্রদূতদের দিয়ে এসব বলিয়ে কোনো লাভ হয় না।
বিদেশিরা আমাদের এখানে প্রায়ই গণতন্ত্রের কথা বলেন। এখন এই সময়ে গণতন্ত্র বলতে ঠিক কী বুঝব, এটিও আমাদের ভেবে দেখতে হবে। কয়েক বছর আগে আমরা দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশের জনসাধারণের মাঝে একটি জরিপ চালিয়েছিলাম। একটি প্রশ্নের উত্তর জানতে চাওয়া হয়েছিল সবার কাছে। প্রশ্নটি ছিল- গণতন্ত্র বলতে কী বোঝেন? জরিপে অংশ নেওয়াদের মধ্যে একটি বড় অংশের অভিমত, তাঁরা গণতন্ত্র বলতে খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের মতো মৌলিক বিষয়গুলোর নিশ্চয়তা চাইছেন। বিপরীতে অল্পসংখ্যক বলেছেন ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তন ও সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা। তাই আমার মনে হয়, জনসাধারণের কথার সুরটাও আমাদের বুঝতে হবে।
বস্তুত আমাদের দেশে বড় বড় রাজনৈতিক দলের মধ্যে বিভাজনের কারণে বিদেশিরা সুযোগ নেন। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিদেশি কূটনীতিকদের নানা তৎপরতা সরকারের মন্ত্রী, নির্বাচন কমিশনসহ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নিয়মিত সাক্ষাতে তাঁরা আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নানা ধরনের মন্তব্য করেন। আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশিদের এই খবরদারির ক্ষেত্র তৈরি করে দেয় বিরোধীরা। যখন যারা বিরোধী দলে থাকে, তখন তারা একই আচরণ করে। বিদেশিদের সুযোগ করে দিতে বিরোধীরা উৎসাহিত হয়। তবে এতে কতটুকু গণতন্ত্র আছে, তা ভাবার বিষয়। আমাদের মধ্যে বিভাজন থাকলে তাঁরা সে সুযোগ তো নেবেনই।
অবশ্য অর্থনীতির কাঠামো যদি ভালো হয়, সে ক্ষেত্রে বিদেশিরা অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সুযোগ নিতে পারবে না। অর্থনীতি যদি আরেকটু শক্তিশালী হয় তাহলে তাঁদের বলা যাবে- প্রটোকলের বাইরে গিয়ে কথা বলা যাবে না। বাংলাদেশ তথাকথিত তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে আজ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অনেক দেশের চেয়ে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ভালো। ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশের গড় আয়ু বেশি। তা ছাড়া অবকাঠামো, যোগাযোগসহ আরও কিছু খাতে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছে।
বিদেশি কূটনীতিকরা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় বিশেষত মানবাধিকার, নির্বাচন নিয়ে যেভাবে কথা বলেন, তা বিশ্বের আর কোথাও পারবেন বলে মনে হয় না। এই কূটনীতিকরাই কিন্তু তাঁদের দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে এটি করতে দেবেন না। ভারতে কি বিদেশি কূটনীতিকরা এভাবে কথা বলতে পারবেন? কিংবা ওয়াশিংটন ডিসিতে নিযুক্ত বাংলাদেশি রাষ্ট্রদূত কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের 'গান ল' পরিবর্তনের কথা বলতে পারবেন? বিষয়টি কি এমন- তারা পরাশক্তি। তাই তাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে বিদেশি রাষ্ট্রদূতরা কথা বলতে পারবেন না? আর আমরা 'দুর্বল' রাষ্ট্র বলে বিদেশিরা আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কথা বলার অবাধ 'স্বাধীনতা' পেয়ে যাবেন?
আমাদের দেশে যারা যখন বিরোধী দলে থাকে, তারাই অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে বিদেশি কূটনীতিকদের কাছে ধরনা দেয়। আবার ওই দলই ক্ষমতায় গেলে তখন আর বিষয়টি পছন্দ করে না। আসলে বিরোধী দল চায় এর মধ্য দিয়ে সরকারের ওপর চাপ তৈরি করতে। বিদেশি কূটনীতিকরাও এর সুযোগ নেন। আমি মনে করি, এর কোনোটাই সমর্থনযোগ্য নয়। মনে রাখা জরুরি, বিদেশি কূটনীতিকরা এভাবে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কথা বলেন সম্পূর্ণ নিজেদের স্বার্থে; বাংলাদেশের কল্যাণে নয়। এ বিষয়টি আমাদের রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও সংবাদমাধ্যম বুঝতে পারলে ভালো।
News Courtesy: