‘কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের দেওয়া নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধ সম্ভব নয়। এই ধরনের পদক্ষেপ সাময়িকভাবে সমস্যার সমাধান করতে পারে। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে সমাধানের জন্য নিজেদের উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফেরানোর পাশাপাশি জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে। জনগণের কাছে জবাবদিহিতার ভয় নিয়ে কোনো সরকার বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারে না।’
বুধবার সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড: বেহাল গণতন্ত্র, প্রশ্নবিদ্ধ আইনের শাসন’ শীর্ষক ওয়েবিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। সিজিএস-এর চেয়ারম্যান ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে ও নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমানের সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশ নেন সাবেক নৌপরিবহণমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শাজাহান খান, বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য জহির উদ্দিন স্বপন, গণঅধিকার পরিষদের আহ্বায়ক ড. রেজা কিবরিয়া, সাবেক রাষ্ট্রদূত এম শফিউল্লাহ, জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ পরিষদের (জানিপপ) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নির্বাহী কমিটির মহাসচিব মো. নূর খান।
শাজাহান খান বলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যা কারও কাম্য নয়, তারপরও ঘটনাগুলো ঘটছে, যা নিন্দনীয়, অগ্রহণযোগ্য। যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, তাদের মতো গণতান্ত্রিক দেশেও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়ে প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। এভাবে পৃথিবীর অনেক দেশেই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হচ্ছে, যা কখনই সমর্থনযোগ্য নয়।
তিনি বলেন, জনগণের শান্তির জন্য সন্ত্রাসীদের দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাহায্য প্রয়োজন হয়। কারণ সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ভয়ে কেউ সাক্ষ্য দিতে চায় না, ফলে তাদেরকে বিচারের আওতায় আনা সম্ভব হয় না। তবে হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক নাকি অরাজনৈতিক, সেটা বিবেচনায় আনতে হবে।
জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যা একটি আন্তর্জাতিক সমস্যায় রূপ নিয়েছে এবং বাংলাদেশকে বিশ্বের সামনে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে। সরকারের এই অপকীর্তির দায়ভার বহন করতে হচ্ছে পুরো রাষ্ট্রকে। এই অবস্থা নিরসনে তিনি রাজনৈতিক কর্তৃত্ববাদী মনোজগৎ থেকে বের হয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার চর্চার মাধ্যমে রাজনীতির মৌলিক সংস্কার করার কথা উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, মূল সমস্যা আমাদের দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যেই। মানবাধিকার উন্নয়নে রাষ্ট্রের মালিক হিসাবে জনগণের কাছে জবাবদিহিতার বিধান নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি করতে হবে।
ড. রেজা কিবরিয়া বলেন, র্যাবের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা জারির পর দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যার সংখ্যা কমলেও তা এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। দেশের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো সব এক জায়গা থেকে আসে। ক্ষমতাসীন দল বিচারবহির্ভূত হত্যাকে ব্যবহার করে ক্ষমতা ধরে রাখার হাতিয়ার হিসাবে। সরকারের যেখানে উচিত বিচারবহির্ভূত হত্যাগুলোর যথাযথ তদন্ত করা, সেখানে সরকার সেটি না করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যারা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, তাদেরকে পুরস্কৃত করছে।
অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ বলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়গুলো উদ্ঘাটন করেই ক্ষান্ত হওয়া যাবে না। বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে আমাদের সবাইকে বের হয়ে আসতে হবে।
মো. নূর খান বলেন, গত তিন বছরে ৫৯০টির মতো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দেশের প্রচলিত আইনে বিচারের আওতায় আনতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি একদিনে গড়ে উঠেনি। এর জন্য প্রধান দুই রাজনৈতিক দলই দায়ী। বিএনপি অপারেশন ক্লিনহার্ট দিয়ে যেটা শুরু করেছিল, আওয়ামী লীগ সেটার সমালোচনা করলেও ক্ষমতায় আসার পর এর বিরুদ্ধে তারা কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।
জিল্লুর রহমান বলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হচ্ছে বিচারিক প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড। সংবিধান অনুযায়ী প্রত্যেক অপরাধীর আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার আছে। অর্থাৎ, একজন ব্যক্তি কোনো অপরাধ করলে সে তার পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ করতে পারবে, সাক্ষ্য উপস্থাপন করতে পারবে। এটি তার মানবাধিকারের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, সেখানে বিচারের আগেই আইনের তোয়াক্কা না করে অভিযুক্তকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে প্রাণ দিতে হচ্ছে।
News Courtesy:


