Centre for Governance Studies, Dhaka

CGS in the media

নির্বাচন কমিশনের কঠোর সমালোচনা বিশিষ্টজনের

Press clipping reproduced from the original publication, as archived on the CGS website.

ইভিএম ব্যবহারে অনমনীয় মনোভাব, বিপুল অর্থব্যয় এবং পর্যবেক্ষকদের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করার নির্দেশনাসহ বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কারণে নির্বাচন কমিশনের কঠোর সমালোচনা করেছেন বিশিষ্টজন। এ ছাড়া স্বাধীনতার এত বছরও বিতর্কমুক্ত নির্বাচন কমিশন গঠন প্রক্রিয়া স্থির করতে ব্যর্থ হওয়ায় রাজনৈতিক দলগুলোরও সমালোচনা করেন তারা।

গতকাল শনিবার ‘ভোটের রাজনীতি ও জনগণের ভোটের অধিকার’ শিরোনামে আয়োজিত সেমিনারে বক্তারা এ কথা বলেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ-বিস মিলনায়তনে এই সেমিনারের আয়োজন করে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ’। প্রতিষ্ঠানের প্রধান অধ্যাপক আতাউর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার ড. এম সাখাওয়াত হোসেন। মূল আলোচক ছিলেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম। আলোচনায় আরও অংশ নেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন, সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল আউয়াল মিন্টু, আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক শ ম রেজাউল করিম, বিএনপির সাবেক এমপি জহিরুদ্দিন স্বপন, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের ‘বঙ্গবন্ধু অধ্যাপক’ ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক, ড. এনামুল হক, নির্বাচন পর্যবেক্ষণ গ্রুপ ফেমার প্রেসিডেন্ট মনিরা খান, স্থপতি মোবাশ্বের হোসাইন, সুপ্রিম কোর্টের সাবেক রেজিস্ট্রার ইকতেদার আহমেদ, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ,

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের সাবেক মহাপরিচালক লে. জেনারেল (অব.) মইনুল ইসলাম, ব্যবসায়ী নেতা আব্দুল হক, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

নাইমুল ইসলাম খান, গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইকারাস ইউএসএ ইনকরপোরেশনের প্রধান নির্বাহী মাহমুদ রেজা চৌধুরী ও সেন্টার ফর গভর্নমেন্ট স্টাডিজের ভাইস চেয়ারম্যান ড. মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরী। সঞ্চালনা করেন চ্যানেল আইয়ের তৃতীয় মাত্রার উপস্থাপক সাংবাদিক জিল্লুর রহমান।

মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, সংবিধান ও আইন অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন যথেষ্ট স্বাধীন। এখন যারা নির্বাচন কমিশনে আছেন, তারা যদি কারও আজ্ঞাবহ হয়ে কাজ করেন তার দায় সরকার কিংবা কোনো রাজনৈতিক দলের নয়। কমিশন চাইলে অনেক কিছুই পরিবর্তন করতে পারে। কিন্তু

কোনো দলের দাবির কাছে নতিস্বীকার করে কিছু করা ঠিক হবে না।

তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগ সব সময়ই নির্বাচন চায় এবং নির্বাচনকেই সরকার পরিবর্তনের একমাত্র পথ বলে বিবেচনা করে। কিন্তু ঐক্যফ্রন্টের নেতা ড. কামাল হোসেন এবং এলডিপি নেতা অলি আহমেদ যখন একই সুরে নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে সন্দেহের কথা বলেন, তখন তা শঙ্কা জাগায়। কিন্তু আওয়ামী লীগ নির্বাচন নিয়ে

কোনো খেলা দেখতে চায় না, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন চায়।

আব্দুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার জন্য ঢালাওভাবে বিএনপিকে দায়ী করা হয়। অথচ তার অভিজ্ঞতা হচ্ছে, তিনি সে সময় ঘরের বাইরেই বের হননি। কিন্তু তার বিরুদ্ধেও পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে ২২টি মামলা দেওয়া হয়েছে। তিনি সে সময়ের সহিংস ঘটনার নেপথ্যে প্রকৃতপক্ষে কারা ছিল, তা বের করার জন্য একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি জানান। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে যে রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা তার ভেতরে নির্বাচন কমিশনকে যতই স্বাধীন করা হোক, সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।

মূল প্রবন্ধে ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আগামী একাদশ জাতীয় নির্বাচন কি অবাধ, সুষ্ঠু এবং বিশ্বাসযোগ্য হবে, না কি ২০১৪ সালের মতই ‘ত্রুটিযুক্ত এবং ব্যর্থ’ হবে, এটাই এই মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, বিদ্যমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হলেও সেটা কি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হবে?

আলোচনায় অংশ নিয়ে ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম বলেন, নির্বাচন ঘিরে যা ঘটছে তা নিয়ে নানা প্রতিক্রিয়া আছে। যেমন সুপ্রিম কোর্টের সামনে প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ আসছেন জামিনের জন্য। তাদের বেশিরভাগই রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী এবং অনেকেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চান। কিন্তু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরও তাদের নির্বাচনী প্রস্তুতি বাদ দিয়ে সুপ্রিম কোর্টে আসতে হচ্ছে জামিনের জন্য। যেসব মামলা হচ্ছে, সেগুলো কী ধরনের মামলা তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। কোনো দল নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, আর কোনো দলের নেতাকর্মীরা আদালতের বারান্দায় ঘুরছেন- এটা স্বাভাবিক পরিস্থিতি নয়। নির্বাচন সুষ্ঠু করতে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

এম হাফিজ উদ্দিন বলেন, ইভিএম ব্যবহার নিয়ে নির্বাচন কমিশনের হঠাৎ সিদ্ধান্ত, বিপুল ব্যয় এবং অনমনীয় অবস্থান প্রশ্নের উদ্রেক করে। নির্বাচন কমিশন যদি প্রশ্নবিদ্ধ কর্মকাণ্ড করে, তাহলে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে সংশয়ের সৃষ্টি হয়। যেটা নির্বাচন কমিশনের বলার কথা, সেটা আগেই সরকার কিংবা সরকারি দলের সাধারণ সম্পাদক বলে দিচ্ছেন- এগুলো মানুষের মনে প্রশ্নের জন্ম দেয়।

ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আমরা ভয়াবহ সংকটে আছি। সংকটের কারণেই অনেক দিন পর সব দল নির্বাচনে অংশ নিলেও সেই নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হবে কি-না তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। যেহেতু দলীয় সরকার এবং সংসদ বহাল রয়েছে, সে কারণে নির্বাচন অনুষ্ঠানে সমতল ক্ষেত্র তৈরি নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। আবার ভোটগ্রহণ ঠিকমতো হলেও ভোট গণনা সঠিকভাবে হওয়া নিয়েও সন্দেহ থাকে। তিনি বলেন, ইভিএম ব্যবহারে নির্বাচন কমিশনের অবস্থান সন্দেহ আরও বাড়িয়েছে।

স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন বলেন, যে রাজনীতিবিদরা তাদের সন্তানকে বিদেশে পাঠিয়ে লেখাপড়া করান এবং বিদেশের নাগরিক হতে উদ্বুদ্ধ করেন, তাদের এ দেশে এমপি-মন্ত্রী হওয়া কতটা নৈতিক তা বিবেচনা করা জরুরি। মাদক ব্যবসার অভিযোগ ওঠায় আবদুর রহমান বদিকে মনোনয়ন না দিয়ে তার স্ত্রীকে মনোনয়ন দেওয়ারও কঠোর সমালোচনা করেন তিনি।

মনিরা খান বলেন, বিগত সময়ে যত নির্বাচন কমিশন হয়েছে তার মধ্যে দু-একটি ছাড়া বাকি সবই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে করা যায় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, তিন স্তরে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে হয়। বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে পর্যবেক্ষণ ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

ড. মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, ইভিএম কেনার জন্য চার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। অথচ ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকায় ২০টি ইউলুপ নির্মাণ করা হলে যানজট অধিকাংশই নিরসন সম্ভব। যথাযথ স্থানে ব্যয় ও গুরুত্ব নির্ধারণ না করাকে নীতি গ্রহণের ক্ষেত্রে একটি সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

News Courtesy: http://samakal.com