একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদলের জন্য রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ বইছে। প্রধান বিরোধী দলসহ সব দলের অংশগ্রহণে প্রথমবারের মতো দলীয় সরকারের অধীনে একাদশ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। কিন্তু সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে জনগণ কি তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে? বর্তমান নির্বাচন কমিশন কি সব দলের সমান সুযোগ দিয়ে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে সক্ষম হবে? ইভিএম ব্যবহার কতটা যৌক্তিক হবে। এমন সব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মধ্যে আসন্ন নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার জন্য নির্বাচন কমিশনকে তার সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগের আহ্বান জানানো হয়েছে।
গতকাল সকালে রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেন রোডে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ আয়োজিত এক সেমিনারে এ আহ্বান জানান বক্তারা। সেন্টার পর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এম আতাউর রহমানের সভাপতিত্বে সেমিনারে ‘রাজনীতি এবং জনগণের ভোটাধিকার’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন। সেমিনারে বক্তব্য রাখেন সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সভাপতি বদিউল আলম মজুমদার, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুল আউয়াল মিন্টু, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, সাংবাদিক নাঈমুল ইসলাম খান।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, স্বাধীনতার এত বছর পরও একটি সুষ্ঠু নির্বাচন ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব হয়নি। দুই দশক ধরে নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। কিন্তু কোনো পরিবর্তন হয়নি। সে কারণে এখন সুশীল সমাজকে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। বাংলাদেশের কোনো নির্বাচন-পরবর্তী অবস্থা ইতিবাচক ছিল না। সে কারণে একাদশ নির্বাচন নিয়ে জনমনে দোলাচল আছে। দলীয় সরকারের অধীনে প্রথমবারের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সুষ্ঠু হয় কিনা সেটা দেখার বিষয়। একই সঙ্গে সংসদ বহাল রেখে সমান সুযোগ তৈরি একটা চ্যালেঞ্জ হবে।
বক্তারা আরো বলেন, জোটের কারণে জনগণের ভোটাধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে। ব্যালট পেপারে ‘না’ ভোট অপশন থাকলে জনগণ তার পছন্দমতো প্রার্থী না পেলে ‘না’ ভোট দিতে পারত। ইভিএম ব্যবহারের ফলে পুরো প্রক্রিয়া জনগণের বিশ্বাসযোগ্য হবে কিনা, প্রশ্ন তুলে এটা ধীরে ধীরে স্থানীয় নির্বাচনগুলোয় ব্যবহার করা যেত বলে জানান তারা।
ইসির বিষয়ে বক্তারা বলেন, আইন করে নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ দেয়ার কথা থাকলেও সেটা কোনো সরকারই করেনি। শুধু সার্চ কমিটি করে নিয়োগ দেয়ায় তাদের নিরপেক্ষতা ও সাহসিকতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আগামী নির্বাচন কেমন হবে, তা নির্বাচন কমিশনের (ইসি) জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। ফেয়ার ইলেকশনের জন্য সরকারকেও এ চ্যালেঞ্জ নিতে হবে, কারণ আন্তর্জাতিক মহল আগামী নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে। নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিকভাবে যথেষ্ট ক্ষমতা আছে। সেই ক্ষমতার মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন করতে হবে। দেশী এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ও মানসম্মত একটি নির্বাচন করতে হবে।
সাবেক এ নির্বাচন কমিশনার বলেন, নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করতে সরকারকে সব ধরনের সহযোগিতা করতে হবে। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক দল এবং নাগরিকের সবার দায়িত্ব আছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম বলেন, আগামী যে নির্বাচন হতে যাচ্ছে, সেই নির্বাচনের মতো অভিজ্ঞতা পাকিস্তান ও ভারতের নেই। বর্তমানে জনগণের ক্ষমতায়ন না করে রাজনৈতিক দলের ক্ষমতায়ন হচ্ছে। পুলিশ, প্রশাসন থেকে শুরু করে সবকিছু রাজনৈতিক দল দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে।
আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কোনোভাবেই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। সুষ্ঠু নির্বাচন করার জন্য যে পরিবেশ দরকার, দেশে সেটা নেই। যতদিন নির্বাচন কমিশন সঠিকভাবে গঠন করতে পারা না যায়, ততদিন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব হবে না। কারণ নির্বাচন কমিশন প্রশাসনিক সাহায্যের ওপর নির্ভর করে। প্রশাসন সরকারের অধীন হওয়ায় সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব হবে না।
জিল্লুর রহমানের উপস্থাপনায় সেমিনারে আরো বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক শ ম রেজাউল করিম, অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক, সাবেক আইজিপি ড. এনামুল হক, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ, বিজিবির প্রতিষ্ঠাকালীন মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট (অব.) মইনুল ইসলাম, ফেমার সভাপতি মুনীরা খান, সাবেক জজ ইকতেদার আহমেদ প্রমুখ।
News Courtesy: www.http://bonikbarta.net/bangla/news