দেশে প্রথমবারের মতো দলীয় সরকার ও সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এ অবস্থায় দলের প্রতি অনুগত সরকারি কর্মকর্তাদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হয়েছে। যারা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এছাড়া আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, নির্বাচন কমিশন এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারেন। আগে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারেন, এমন কর্মকর্তাদের সরিয়ে অপেক্ষাকৃত কম পক্ষপাতদুষ্ট ব্যক্তিদের নির্বাচনী কাজে নিয়োগ দেয়া হতো। কিন্তু বর্তমান নির্বাচন কমিশন অনেক পুলিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযাগ উঠলেও তাদের বদলি করেনি। তাই আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হওয়া নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে পুলিশ ও কর্মকর্তার ওপর খবরদারি না করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
গতকাল সকালে রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেন রোডে অবস্থিত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) মিলনায়তনে সেন্টার পর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত এক সেমিনারে এ আহ্বান জানান বক্তারা। সিজিএসের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এম আতাউর রহমানের সভাপতিত্বে সেমিনারে ‘ভোটাররা কি স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন?’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সভাপতি বদিউল আলম মজুমদার। এতে বক্তব্য রাখেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, লেখক ও গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক পরিষদের (জানিপপ) চেয়ারম্যান ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল প্রমুখ।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ও এর আগের প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশন ভোটের আগেই যেসব জেলার পুলিশ ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে তাদের বদলি করতেন। কিন্তু এবারের নির্বাচন কমিশন তার কিছুই করেনি। শুধু একজন পুলিশ সুপারকে বদলি করা হয়েছে। পুলিশ প্রশাসনের অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ থাকা সত্ত্বেও ইসি তাদের বদলি করেনি। আগে নির্বাচনে পুলিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে কেউ পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের অভিযোগ তোলেনি। কিন্তু বর্তমানে অনেকের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ নির্বাচন কমিশনে জমা দিলেও তাদের বদলি করা হয়নি। যদি চিহ্নিত কর্মকর্তাদের বদলি না করা হয় তাহলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। এ সময় বক্তারা প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন না করার কথা উল্লেখ করে সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পুলিশ প্রশাসনের ওপর খবরদারি না করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
সম্প্রতি সাবেক সিনিয়র সচিবদের একটি দল গণভবনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশের বিষয়টি উল্লেখ করে তারা বলেন, এসব সাবেক আমলার অনেকে সদ্য চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। এসব আমলার একাত্মতা প্রকাশের মধ্য দিয়ে সারা দেশে চাকরিতে থাকা বর্তমান কর্মকর্তাদের প্রতি এক ধরনের বার্তা দেয়া হচ্ছে যে, যদি এসব কর্মকর্তার মতো উচ্চপদ নিয়ে অবসরে যেতে চাও, তাহলে তাদের মতো পথ ধরতে হবে। যেটা খুব বাজে একটি নজির। প্রশাসনে যারা থাকবে, তাদের নিরপেক্ষ থাকতে হবে, সম্পূর্ণ আইনের পক্ষে থাকতে হবে।
বর্তমান সরকারি কর্মকর্তারা উপরের ফোন কলের ভিত্তিতে কাজ করেন মন্তব্য করে বক্তারা বলেন, বিভিন্ন জেলায় যারা পুলিশ ও প্রশাসনে আছেন তাদের নিয়ে আশঙ্কা আছে তারা সঠিকভাবে চলবেন কিনা। যে প্রক্রিয়ায় নির্বাচন হচ্ছে সেখানে পুলিশ, প্রশাসন, নির্বাচনী কর্মকর্তারা সবাই একমুখী হয়ে কাজ করছেন। এ অবস্থায় নির্বাচন ফ্রি হলেও ফেয়ার না-ও হতে পারে। কেন্দ্রে ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতি হলেও ভোট গণনার সময় ফলাফল উল্টে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। ফলে পুলিশ প্রশাসনের ওপর সুষ্ঠু নির্বাচন নির্ভর করছে। নির্বাচন কমিশনের এখন সত্যিকার পরীক্ষার সময় এসেছে। একই সঙ্গে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হওয়ায় সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব অনেক বেশি। যেখানে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হচ্ছে, তাদের প্রচারণা মিছিল-মিটিং করতে দেয়া হচ্ছে না; সেখানে এটাকে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন বলা যাবে না।
মূল প্রবন্ধে সুজন সম্পাদক বলেন, সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদে নির্বাচন কমিশন নিয়োগ দানের জন্য আইন প্রণয়ন করার কথা বলা হলেও এখন পর্যন্ত সেটা করা হয়নি। একটি অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন নিয়োগ দেয়া হয়েছে, যেটা অস্বচ্ছ। কমিশনের কারো কারো বিরুদ্ধে দলীয় আনুগত্যের অভিযোগ রয়েছে। নির্বাচন বিশ্বাস ও গ্রহণযোগ্য হবে কিনা, সেটা বহুলাংশে নির্ভর করে কমিশনের সদস্যদের নিরপেক্ষতা ও সাহসিকতার ওপর। কিন্তু বর্তমান নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে অনেকের মনে সন্দেহ আছে।
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের সব দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা নির্বাহী বিভাগের কর্তব্য। আর প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নির্বাহী বিভাগ বা সরকারের অংশ। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত অতীতের মতো বর্তমান সরকারও দলের প্রতি অনুগত ব্যক্তিদের নিয়ে যে বাগান সাজিয়ে রেখেছে তা ভাঙতে বর্তমান নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। সরকার যদি নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে চায় তাহলে নির্বাচন কমিশনের পক্ষেও সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়। এ অবস্থায় সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সদাচরণ, সংসদ সদস্যদের প্রভাব না খাটানো, গণমাধ্যমকে সঠিক চিত্র তুলে ধরা এবং সুশীল সমাজ ও পর্যবেক্ষকদের নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।
জিল্লুর রহমানের উপস্থাপনায় আয়োজিত সেমিনারে আরো বক্তব্য রাখেন সাবেক মন্ত্রী শেখ শহিদুল ইসলাম, সাবেক এফবিসিসিআই সভাপতি মীর নাসির হোসেন, দ্য নিউজ টুডের সম্পাদক রিয়াজউদ্দিন আহমেদ, সাবেক রাষ্ট্রদূত এম সফিউল্লাহ, সাবেক প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী প্রমুখ।
News Courtesy: http://bonikbarta.net